ঢাকা ০২:৪১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৩০ বছরে নগরীতে ৪ হাজার পুকুর নিখোঁজ, বাকিগুলোও যেন ‘মরণাপন্ন’

  • আপডেট সময় : ০৭:৩১:০৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 77
  • কংক্রিটের আগ্রাসনে জলাধারের শহর চট্টগ্রাম এখন ধূসর মরুভূমি, নেপথ্যে ‘পারস্পরিক দোষারোপের’ রাজনীতি

  • আইনের তোয়াক্কা না করে রাতের আঁধারে ভরাট

  • তাপমাত্রা ও জলাবদ্ধতার মহাবিপর্যয়ের মুখে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কথার লড়াই

রাসেল চৌধুরী :

 

পাহাড়, নদী আর অসংখ্য ঐতিহাসিক জলাশয়ের কারণে ঐতিহ্যগতভাবে অনন্য বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এখন এক চরম পরিবেশগত আত্মহননের পথে। বিগত তিন দশকে উন্নয়নের নামে এবং আবাসন ব্যবসার অশুভ থাবায় চট্টগ্রাম মহানগরের বুক থেকে হারিয়ে গেছে প্রায় ৪ হাজার পুকুর ও দীঘি। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৮০-এর দশকে মহানগরে পুকুর ও জলাশয় ছিল প্রায় ২৫ হাজার। ২০০৮ সালের মাস্টারপ্ল্যানে (ড্যাপ) তা নেমে আসে ৫ হাজার ৩১টিতে। আর ২০২৬ সালের বর্তমান বাস্তবতায় মহানগরে কোনোমতে টিকে আছে মাত্র ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজারটি জলাধার, যার সিংহভাগই আবর্জনা আর কচুরিপানায় মৃতপ্রায়।

 

নগরের এই মহাবিপর্যয় এবং এর নেপথ্যের প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও জটিলতা নিয়ে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধনে পাহাড়তলী কাজির দীঘি এলাকার বাসিন্দা আলহাজ্ব শফিউল আলম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের চোখের সামনে রাতের আঁধারে ট্রাকে করে মাটি এনে দীঘি-পুকুর ভরাট করা হয়। আগে এই পুকুরের পানি দিয়ে পুরো এলাকার মানুষ রান্নাবান্না ও গোসল করত। এখন আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের পানি নেওয়ার মতো কোনো পুকুর বাকি নেই। আমরা সাধারণ মানুষ বাধা দিলে উল্টো মামলা আর হামলার হুমকি দেওয়া হয়। প্রশাসনকে জানিয়েও লাভ হয় না, তারা আসে সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর।

 

একই সুরে উদ্বেগ প্রকাশ করে চট্টগ্রামের প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সিকান্দার খান বলেন, “পুকুর ও দীঘিগুলো ছিল চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক ফুসফুস এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক। এগুলোকে আমরা স্রেফ কিছু জমি হিসেবে দেখছি, যা চরম মূর্খতা। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যের পাশাপাশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নগরী বলা হলেও তার মূল রূপকে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। শহরের ভেতরে পানির আধার না থাকলে একসময় এই শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।

 

বাংলাদেশ পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন (বাপসা) ও চট্টগ্রামের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর জোটের নেতা এম এ হাশেম রাজু প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “স্থানীয় ভূমিদস্যু, আবাসন মাফিয়া এবং সিডিএ-সিটি কর্পোরেশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার ত্রিপক্ষীয় যোগসাজশ ছাড়া পুকুর ভরাট করা অসম্ভব। তারা প্রথমে পুকুরকে ময়লার ভাগাড় বানায়, তারপর ব্যবহার অনুপযোগী দেখিয়ে ‘নাল জমি’ হিসেবে সিডিএ থেকে নকশা পাস করায়। আইন কেবল কাগজে, মাঠপর্যায়ে এর কোনো বাস্তব প্রয়োগ নেই। আমরা পুকুর রক্ষায় আর কোনো আশ্বাস চাই না, দৃশ্যমান কঠোর অ্যাকশন চাই।

 

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রামের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুদীপ মণি আইনি বাধ্যবাধকতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী, মাস্টারপ্ল্যানে চিহ্নিত কোনো জলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তন বা ভরাট করা সম্পূর্ণ ফৌজদারি অপরাধ। হাইকোর্টের একাধিক স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, ভরাট করা পুকুর পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে। সিডিএ বা পরিবেশ অধিদপ্তর আইনের এই धाराओं প্রয়োগ করে না বললেই চলে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও জেল না দিলে এই মহোৎসব থামানো যাবে না।

 

এদিকে পুকুর ভরাটের সত্যতা স্বীকার করে আত্মপক্ষ সমর্থনে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিদর্শক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলেন, “আমরা অবৈধভাবে পুকুর ভরাটের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাই, নোটিশ করি এবং মামলাও দিই। কিন্তু আমাদের চরম জনবল সংকট রয়েছে। সারা শহর পাহারা দেওয়া আমাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়।।

 

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমরা যে পুকুর ভরাটের দায়ে মামলা করি, সেই একই দাগের ভূমির ওপর চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদন দিয়ে দেয়! সিডিএ যদি জলাশয়ের ওপর নকশা অনুমোদন বন্ধ না করে, তবে আমাদের একার পক্ষে পরিবেশ রক্ষা করা কঠিন।

 

পরিবেশ অধিদপ্তরের এই অভিযোগের জবাবে সিডিএ-এর নগর পরিকল্পনাবিদ ও উপ-নগর পরিকল্পনাবিদ (নকশা অনুমোদন শাখা) বলেন, “সিডিএ স্বপ্রণোদিত হয়ে কোনো পুকুরের ওপর ভবনের অনুমোদন দেয় না। আবেদনকারীরা যখন জেলা প্রশাসকের ভূমি অফিস বা ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ‘শ্রেণি পরিবর্তন’ বা ‘নাল জমি’ হিসেবে খতিয়ান ও নামজারি দাখিল করে, তখন আইনগতভাবে সিডিএ-এর নকশা অনুমোদন করতে হয়। তাছাড়া ডিজিটাল সার্ভে ও বিএস রেকর্ডের ত্রুটির কারণে অনেক সময় নকশা পাস হয়ে যায়। দায়টি এককভাবে সিডিএ-এর নয়, বরং সমন্বিত নজরদারির অভাব।

 

এই প্রাতিষ্ঠানিক টানাপোড়েন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী আলী আশরাফ বলেন, “চট্টগ্রামের সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নেই। সিডিএ ড্যাপ বানায় কিন্তু ভূমি অফিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সাথে তার কোনো ডিজিটাল ডেটাবেজ শেয়ারিং নেই।

 

একটি আদর্শ শহরের অন্তত ১০-১২ শতাংশ জলাভূমি থাকা দরকার, চট্টগ্রামে যা ১ শতাংশের নিচে। এখনই জরুরি ভিত্তিতে যে ২ হাজার পুকুর অবশিষ্ট আছে, সেগুলোকে ‘ঐতিহ্যগত জলাধার’ ঘোষণা করে সীমানা প্রাচীর ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করতে হবে।

 

সংকট সমাধানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, “চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানে শুধু ফ্লাইওভার বা ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ নয়, নাগরিকদের স্বাস্থ্য, নিরাপদ পরিবেশ এবং ঐতিহ্য রক্ষা করাও আমার সমান দায়িত্ব। আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই—পাহাড়খেকো কিংবা পুকুরখেকোদের কোনো জায়গা চট্টগ্রামে হবে না! পুকুরগুলো ভরাট হওয়ার কারণেই আজ সামান্য বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের ৮০ শতাংশ এলাকা পানিবন্দী হয়ে পড়ে। আমি ইতিমধ্যে চসিকের পক্ষ থেকে একটি কঠোর মনিটরিং সেল গঠনের নির্দেশ দিয়েছি। সিডিএ এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে সাথে নিয়ে আমরা সমন্বিত উচ্ছেদ অভিযান চালাব। ভরাট হওয়া প্রধান জলাশয়গুলো পুনরুদ্ধার করে সেগুলোকে ঢাকার হাতিরঝিলের মতো আধুনিক বিনোদন স্পটে রূপান্তর করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।

 

বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য আর সরকারি সংস্থাগুলোর ফাইল চালাচালির মাঝখানে প্রতিদিন নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের একেকটি প্রাণপ্রদ জলাশয়। কথার লড়াই বন্ধ করে মেয়র, সিডিএ এবং পরিবেশ অধিদপ্তর যদি এখনই এক টেবিলে বসে কঠোর অ্যাকশনে না যায়, তবে অচিরেই প্রকৃতির নির্মম প্রতিশোধের (তীব্র তাপপ্রবাহ ও স্থায়ী জলাবদ্ধতা) মুখে ধ্বংস হবে দেশের এই বাণিজ্যিক রাজধানী।

৫০০ কোটি টাকার ঐতিহাসিক স্টার্টআপ তহবিল ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

৩০ বছরে নগরীতে ৪ হাজার পুকুর নিখোঁজ, বাকিগুলোও যেন ‘মরণাপন্ন’

আপডেট সময় : ০৭:৩১:০৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • কংক্রিটের আগ্রাসনে জলাধারের শহর চট্টগ্রাম এখন ধূসর মরুভূমি, নেপথ্যে ‘পারস্পরিক দোষারোপের’ রাজনীতি

  • আইনের তোয়াক্কা না করে রাতের আঁধারে ভরাট

  • তাপমাত্রা ও জলাবদ্ধতার মহাবিপর্যয়ের মুখে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কথার লড়াই

রাসেল চৌধুরী :

 

পাহাড়, নদী আর অসংখ্য ঐতিহাসিক জলাশয়ের কারণে ঐতিহ্যগতভাবে অনন্য বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এখন এক চরম পরিবেশগত আত্মহননের পথে। বিগত তিন দশকে উন্নয়নের নামে এবং আবাসন ব্যবসার অশুভ থাবায় চট্টগ্রাম মহানগরের বুক থেকে হারিয়ে গেছে প্রায় ৪ হাজার পুকুর ও দীঘি। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৮০-এর দশকে মহানগরে পুকুর ও জলাশয় ছিল প্রায় ২৫ হাজার। ২০০৮ সালের মাস্টারপ্ল্যানে (ড্যাপ) তা নেমে আসে ৫ হাজার ৩১টিতে। আর ২০২৬ সালের বর্তমান বাস্তবতায় মহানগরে কোনোমতে টিকে আছে মাত্র ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজারটি জলাধার, যার সিংহভাগই আবর্জনা আর কচুরিপানায় মৃতপ্রায়।

 

নগরের এই মহাবিপর্যয় এবং এর নেপথ্যের প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও জটিলতা নিয়ে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধনে পাহাড়তলী কাজির দীঘি এলাকার বাসিন্দা আলহাজ্ব শফিউল আলম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের চোখের সামনে রাতের আঁধারে ট্রাকে করে মাটি এনে দীঘি-পুকুর ভরাট করা হয়। আগে এই পুকুরের পানি দিয়ে পুরো এলাকার মানুষ রান্নাবান্না ও গোসল করত। এখন আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের পানি নেওয়ার মতো কোনো পুকুর বাকি নেই। আমরা সাধারণ মানুষ বাধা দিলে উল্টো মামলা আর হামলার হুমকি দেওয়া হয়। প্রশাসনকে জানিয়েও লাভ হয় না, তারা আসে সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর।

 

একই সুরে উদ্বেগ প্রকাশ করে চট্টগ্রামের প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সিকান্দার খান বলেন, “পুকুর ও দীঘিগুলো ছিল চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক ফুসফুস এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক। এগুলোকে আমরা স্রেফ কিছু জমি হিসেবে দেখছি, যা চরম মূর্খতা। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যের পাশাপাশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নগরী বলা হলেও তার মূল রূপকে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। শহরের ভেতরে পানির আধার না থাকলে একসময় এই শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।

 

বাংলাদেশ পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন (বাপসা) ও চট্টগ্রামের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর জোটের নেতা এম এ হাশেম রাজু প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “স্থানীয় ভূমিদস্যু, আবাসন মাফিয়া এবং সিডিএ-সিটি কর্পোরেশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার ত্রিপক্ষীয় যোগসাজশ ছাড়া পুকুর ভরাট করা অসম্ভব। তারা প্রথমে পুকুরকে ময়লার ভাগাড় বানায়, তারপর ব্যবহার অনুপযোগী দেখিয়ে ‘নাল জমি’ হিসেবে সিডিএ থেকে নকশা পাস করায়। আইন কেবল কাগজে, মাঠপর্যায়ে এর কোনো বাস্তব প্রয়োগ নেই। আমরা পুকুর রক্ষায় আর কোনো আশ্বাস চাই না, দৃশ্যমান কঠোর অ্যাকশন চাই।

 

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রামের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুদীপ মণি আইনি বাধ্যবাধকতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী, মাস্টারপ্ল্যানে চিহ্নিত কোনো জলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তন বা ভরাট করা সম্পূর্ণ ফৌজদারি অপরাধ। হাইকোর্টের একাধিক স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, ভরাট করা পুকুর পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে। সিডিএ বা পরিবেশ অধিদপ্তর আইনের এই धाराओं প্রয়োগ করে না বললেই চলে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও জেল না দিলে এই মহোৎসব থামানো যাবে না।

 

এদিকে পুকুর ভরাটের সত্যতা স্বীকার করে আত্মপক্ষ সমর্থনে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিদর্শক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলেন, “আমরা অবৈধভাবে পুকুর ভরাটের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাই, নোটিশ করি এবং মামলাও দিই। কিন্তু আমাদের চরম জনবল সংকট রয়েছে। সারা শহর পাহারা দেওয়া আমাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়।।

 

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমরা যে পুকুর ভরাটের দায়ে মামলা করি, সেই একই দাগের ভূমির ওপর চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদন দিয়ে দেয়! সিডিএ যদি জলাশয়ের ওপর নকশা অনুমোদন বন্ধ না করে, তবে আমাদের একার পক্ষে পরিবেশ রক্ষা করা কঠিন।

 

পরিবেশ অধিদপ্তরের এই অভিযোগের জবাবে সিডিএ-এর নগর পরিকল্পনাবিদ ও উপ-নগর পরিকল্পনাবিদ (নকশা অনুমোদন শাখা) বলেন, “সিডিএ স্বপ্রণোদিত হয়ে কোনো পুকুরের ওপর ভবনের অনুমোদন দেয় না। আবেদনকারীরা যখন জেলা প্রশাসকের ভূমি অফিস বা ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ‘শ্রেণি পরিবর্তন’ বা ‘নাল জমি’ হিসেবে খতিয়ান ও নামজারি দাখিল করে, তখন আইনগতভাবে সিডিএ-এর নকশা অনুমোদন করতে হয়। তাছাড়া ডিজিটাল সার্ভে ও বিএস রেকর্ডের ত্রুটির কারণে অনেক সময় নকশা পাস হয়ে যায়। দায়টি এককভাবে সিডিএ-এর নয়, বরং সমন্বিত নজরদারির অভাব।

 

এই প্রাতিষ্ঠানিক টানাপোড়েন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী আলী আশরাফ বলেন, “চট্টগ্রামের সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নেই। সিডিএ ড্যাপ বানায় কিন্তু ভূমি অফিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সাথে তার কোনো ডিজিটাল ডেটাবেজ শেয়ারিং নেই।

 

একটি আদর্শ শহরের অন্তত ১০-১২ শতাংশ জলাভূমি থাকা দরকার, চট্টগ্রামে যা ১ শতাংশের নিচে। এখনই জরুরি ভিত্তিতে যে ২ হাজার পুকুর অবশিষ্ট আছে, সেগুলোকে ‘ঐতিহ্যগত জলাধার’ ঘোষণা করে সীমানা প্রাচীর ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করতে হবে।

 

সংকট সমাধানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, “চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানে শুধু ফ্লাইওভার বা ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ নয়, নাগরিকদের স্বাস্থ্য, নিরাপদ পরিবেশ এবং ঐতিহ্য রক্ষা করাও আমার সমান দায়িত্ব। আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই—পাহাড়খেকো কিংবা পুকুরখেকোদের কোনো জায়গা চট্টগ্রামে হবে না! পুকুরগুলো ভরাট হওয়ার কারণেই আজ সামান্য বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের ৮০ শতাংশ এলাকা পানিবন্দী হয়ে পড়ে। আমি ইতিমধ্যে চসিকের পক্ষ থেকে একটি কঠোর মনিটরিং সেল গঠনের নির্দেশ দিয়েছি। সিডিএ এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে সাথে নিয়ে আমরা সমন্বিত উচ্ছেদ অভিযান চালাব। ভরাট হওয়া প্রধান জলাশয়গুলো পুনরুদ্ধার করে সেগুলোকে ঢাকার হাতিরঝিলের মতো আধুনিক বিনোদন স্পটে রূপান্তর করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।

 

বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য আর সরকারি সংস্থাগুলোর ফাইল চালাচালির মাঝখানে প্রতিদিন নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের একেকটি প্রাণপ্রদ জলাশয়। কথার লড়াই বন্ধ করে মেয়র, সিডিএ এবং পরিবেশ অধিদপ্তর যদি এখনই এক টেবিলে বসে কঠোর অ্যাকশনে না যায়, তবে অচিরেই প্রকৃতির নির্মম প্রতিশোধের (তীব্র তাপপ্রবাহ ও স্থায়ী জলাবদ্ধতা) মুখে ধ্বংস হবে দেশের এই বাণিজ্যিক রাজধানী।