ঢাকা ০৪:০৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্ষুধার ঘরে নেই সান্ত্বনার ভাষা: ৩১ দিনের ব্যবধানে মা-বাবা দুজনেই লাশ, অবুঝ চার বোনের এখন কী হবে?

  • আপডেট সময় : ০৪:০১:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 63

বিশেষ প্রতিবেদক

মায় মরে যাওয়ার পর বোনডি লেহাপড়া ছাড়ছিল ঘরের ক্ষিদা মিটাইতে। আইজ বাপেও আমাগোরে ফেইল্যা চইল্যা গেল। অহন আমাগো কে খাওয়াইবো, কই যামু আমরা?”—ভেঙে পড়া গলায় কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় মূর্ছা যাচ্ছিল ১২ বছর বয়সী অবুঝ মেয়েটি। পাশে বসা তার ৫ বছরের ছোট বোনটি তখনো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে খুঁজছে তার বাবাকে। সে এখনো জানে না, তার জন্য পৃথিবীতে সান্ত্বনার কোনো ভাষা আর অবশিষ্ট নেই।

 

ঢাকার দোহার উপজেলার বিলাশপুর ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামে এক মাসের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া দুটি আত্মহনন কেবল দুটি জীবনের অবসান নয়; বরং অভাবের নির্মম বাস্তবতার কাছে একটি সাজানো পরিবারের নিঃশব্দে ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়ার ট্র্যাজেডি। সংসারের নিত্যদিনের অনটন সইতে না পেরে গত ২৮ আগস্ট গলায় ফাঁস দিয়েছিলেন মা ফরিদা বেগম (৩৮)। আর ঠিক ৩১ দিনের মাথায়, গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে একই ঘরের তালাবদ্ধ দরজার ওপাশে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেলেন তাঁর কৃষক স্বামী আবুল কালাম আজাদও (৫০)।

 

 

বড় মেয়ের বিয়ে হলেও বাকি চার বোনের জীবনের আকাশ এখন মা-বাবাহীন চরম এক অনিশ্চয়তায় ঢাকা। অভাবের তীব্রতায় মায়ের মৃত্যুর পরপরই বড় তিন বোন স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন ছোট দুই বোন, যাদের বয়স মাত্র সাত ও পাঁচ বছর, তাদের নিয়ে তারা কোথায় দাঁড়াবে—সেই প্রশ্ন এখন পুরো সমাজের সামনে।

 

রাধানগর গ্রামের বাসিন্দা মৃত ওয়াহাব মাতবরের ছেলে আবুল কালাম আজাদ পেশায় ছিলেন সাধারণ কৃষক। কৃষিকাজের পাশাপাশি ৫টি গরু পালন করে দিনরাত এক করে খাটতেন তিনি। কিন্তু ক্রমবর্ধমান অভাব আর ঋণের বোঝা কোনোভাবেই নামাতে পারছিলেন না। প্রতিবেশীরা জানান, এক মাস আগে স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই কালাম মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলেন এবং নিজেকে একপ্রকার গৃহবন্দী করে ফেলেছিলেন।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কালামের এক নিকট প্রতিবেশী বলেন, বউটা মারা যাওয়ার পর কালাম মিয়া একদম পাথর হয়া গেছিল। কারো সাথে কথা কইত না। মঙ্গলবার সকালে হুট করে বাড়ির সবার সামনে আইসা বলতেছিল—‘আমার কোনো ভুলত্রুটি হইলে আপনারা আমারে ক্ষমা কইরা দিয়েন।’ আমরা ভাবি নাই এই ক্ষমার আড়ালে সে নিজে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।ক্ষমা চাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই নিজ কক্ষে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেন কালাম। দুপুরের দিকে অনেক ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে স্বজনরা দরজা ভেঙে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

 

হৃদয়বিদারক এই ঘটনার পর রাধানগর গ্রামে এখন শোকের মাতম। খবর পেয়ে দোহার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) প্রসাদ কুমার চাকী ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে মরদেহ থানায় নিয়ে আসেন। দোহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক বলেন, পাঁচটি সন্তান রেখে স্বামী-স্ত্রীর এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত সন্তানদের জন্য অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং হতাশাজনক। আমরা আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা পাঠাচ্ছি।

 

এদিকে ঘটনাটি জানার পর তাৎক্ষণিকভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন। দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গভীর দুঃখ প্রকাশ করে জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত মমান্তিক ও দুঃখজনক। মা-বাবা হারানো এই চার মেয়ের ভরণপোষণ এবং পড়াশোনার দায়িত্ব নিতে আমরা ইতিমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছি। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে তাৎক্ষণিক সহায়তার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এনে এই মেয়েদের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি স্থায়ী কল্যাণ তহবিল গঠনসহ সব ধরনের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।

 

একটি হাসিখুশি সংসার কীভাবে অভাবের করাল গ্রাসে পড়ে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেল, তা দেখে স্তব্ধ পুরো রাধানগর গ্রাম। মা-বাবার এই নির্মম বিদায়ের পর এখন চার বোনের কান্নাভেজা চোখ দুটি তাকিয়ে আছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।

৫০০ কোটি টাকার ঐতিহাসিক স্টার্টআপ তহবিল ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

ক্ষুধার ঘরে নেই সান্ত্বনার ভাষা: ৩১ দিনের ব্যবধানে মা-বাবা দুজনেই লাশ, অবুঝ চার বোনের এখন কী হবে?

আপডেট সময় : ০৪:০১:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশেষ প্রতিবেদক

মায় মরে যাওয়ার পর বোনডি লেহাপড়া ছাড়ছিল ঘরের ক্ষিদা মিটাইতে। আইজ বাপেও আমাগোরে ফেইল্যা চইল্যা গেল। অহন আমাগো কে খাওয়াইবো, কই যামু আমরা?”—ভেঙে পড়া গলায় কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় মূর্ছা যাচ্ছিল ১২ বছর বয়সী অবুঝ মেয়েটি। পাশে বসা তার ৫ বছরের ছোট বোনটি তখনো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে খুঁজছে তার বাবাকে। সে এখনো জানে না, তার জন্য পৃথিবীতে সান্ত্বনার কোনো ভাষা আর অবশিষ্ট নেই।

 

ঢাকার দোহার উপজেলার বিলাশপুর ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামে এক মাসের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া দুটি আত্মহনন কেবল দুটি জীবনের অবসান নয়; বরং অভাবের নির্মম বাস্তবতার কাছে একটি সাজানো পরিবারের নিঃশব্দে ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়ার ট্র্যাজেডি। সংসারের নিত্যদিনের অনটন সইতে না পেরে গত ২৮ আগস্ট গলায় ফাঁস দিয়েছিলেন মা ফরিদা বেগম (৩৮)। আর ঠিক ৩১ দিনের মাথায়, গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে একই ঘরের তালাবদ্ধ দরজার ওপাশে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেলেন তাঁর কৃষক স্বামী আবুল কালাম আজাদও (৫০)।

 

 

বড় মেয়ের বিয়ে হলেও বাকি চার বোনের জীবনের আকাশ এখন মা-বাবাহীন চরম এক অনিশ্চয়তায় ঢাকা। অভাবের তীব্রতায় মায়ের মৃত্যুর পরপরই বড় তিন বোন স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন ছোট দুই বোন, যাদের বয়স মাত্র সাত ও পাঁচ বছর, তাদের নিয়ে তারা কোথায় দাঁড়াবে—সেই প্রশ্ন এখন পুরো সমাজের সামনে।

 

রাধানগর গ্রামের বাসিন্দা মৃত ওয়াহাব মাতবরের ছেলে আবুল কালাম আজাদ পেশায় ছিলেন সাধারণ কৃষক। কৃষিকাজের পাশাপাশি ৫টি গরু পালন করে দিনরাত এক করে খাটতেন তিনি। কিন্তু ক্রমবর্ধমান অভাব আর ঋণের বোঝা কোনোভাবেই নামাতে পারছিলেন না। প্রতিবেশীরা জানান, এক মাস আগে স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই কালাম মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলেন এবং নিজেকে একপ্রকার গৃহবন্দী করে ফেলেছিলেন।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কালামের এক নিকট প্রতিবেশী বলেন, বউটা মারা যাওয়ার পর কালাম মিয়া একদম পাথর হয়া গেছিল। কারো সাথে কথা কইত না। মঙ্গলবার সকালে হুট করে বাড়ির সবার সামনে আইসা বলতেছিল—‘আমার কোনো ভুলত্রুটি হইলে আপনারা আমারে ক্ষমা কইরা দিয়েন।’ আমরা ভাবি নাই এই ক্ষমার আড়ালে সে নিজে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।ক্ষমা চাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই নিজ কক্ষে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেন কালাম। দুপুরের দিকে অনেক ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে স্বজনরা দরজা ভেঙে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

 

হৃদয়বিদারক এই ঘটনার পর রাধানগর গ্রামে এখন শোকের মাতম। খবর পেয়ে দোহার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) প্রসাদ কুমার চাকী ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে মরদেহ থানায় নিয়ে আসেন। দোহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক বলেন, পাঁচটি সন্তান রেখে স্বামী-স্ত্রীর এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত সন্তানদের জন্য অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং হতাশাজনক। আমরা আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা পাঠাচ্ছি।

 

এদিকে ঘটনাটি জানার পর তাৎক্ষণিকভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন। দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গভীর দুঃখ প্রকাশ করে জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত মমান্তিক ও দুঃখজনক। মা-বাবা হারানো এই চার মেয়ের ভরণপোষণ এবং পড়াশোনার দায়িত্ব নিতে আমরা ইতিমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছি। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে তাৎক্ষণিক সহায়তার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এনে এই মেয়েদের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি স্থায়ী কল্যাণ তহবিল গঠনসহ সব ধরনের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।

 

একটি হাসিখুশি সংসার কীভাবে অভাবের করাল গ্রাসে পড়ে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেল, তা দেখে স্তব্ধ পুরো রাধানগর গ্রাম। মা-বাবার এই নির্মম বিদায়ের পর এখন চার বোনের কান্নাভেজা চোখ দুটি তাকিয়ে আছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।