রাসেল চৌধুরী :
দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এখন এক নজিরবিহীন ও শ্বাসরুদ্ধকর মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের সাথে যুক্ত হওয়া স্মরণকালের ভয়াবহ যানজট নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে আক্ষরিক অর্থেই বিষিয়ে তুলেছে। গৃহস্থালির চুলা থেকে শুরু করে গণপরিবহনের ফুয়েল ট্যাংক—সবখানেই শুধু হাহাকার। তীব্র গ্যাস সংকটে চালকদের চাকা না ঘোরায় অনেক নিম্নবিত্ত পরিবারে এখন উনুন জ্বলছে না, দিনের পর দিন পার করতে হচ্ছে আধা-পেটা বা না খেয়ে। অন্যদিকে, লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে কলকারখানার চাকা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা পুরো চট্টগ্রামের জনজীবনকে এক চরম নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

গত কয়েকদিন ধরে নগরীর ফৌজদারহাট, অক্সিজেন মোড়, বহদ্দারহাট, ষোলশহর এবং অলঙ্কার মোড়ের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোর চিত্র দেখলে মনে হবে এটি কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত নগরী। প্রধান প্রধান সড়কগুলোর এক থেকে দুই কিলোমিটার জুড়ে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকছে সিএনজি অটোরিকশা ও মিনিবাসের দীর্ঘ সারি।
চালকেরা বিকেল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে পরদিন সকাল পর্যন্ত বিনিদ্র রজনী পার করছেন। কিন্তু ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের প্রেসার (PSIG) আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাস মিলছে না।
লাইনে সময় অপচয় হওয়ায় রাস্তায় গাড়ি নামাতে পারছেন না চালকেরা। দৈনিক চুক্তিভিত্তিক আয়ের এই মানুষগুলোর পকেট এখন পুরোপুরি শূন্য। আক্ষেপ করে এক চালক বলেন, “সারারাত লাইনে খাড়ায় থাইকাও গ্যাস পাই নাই। জমানো টাকা শেষ, আজ ঘরে চাল কেনার পয়সা নাই। পরিবার নিয়া না খাইয়া মরার দশা আমাগো।”
ফিলিং স্টেশনগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই দীর্ঘ লাইনের কারণে চট্টগ্রামের মূল সড়কগুলো সংকুচিত হয়ে পড়েছে। চার লেনের সড়কের দুই লেনই এখন অপেক্ষমাণ গাড়ির দখলে। এর ফলে পিক-আওয়ারে পুরো নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদ কিংবা চকবাজার থেকে জিইসি মোড়—যেকোনো দূরত্ব পার হতে আগের চেয়ে চার গুণ বেশি সময় লাগছে। তীব্র গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন সাধারণ যাত্রী ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (mmcfd), যার বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেক বা ১৮০-২১0 মিলিয়ন ঘনফুটে।
গ্যাস সংকটের কারণে রাউজান তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে শহর এলাকায় দিনে-রাতে ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা এবং গ্রামীণ এলাকায় প্রায় ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত ভয়াবহ লোডশেডিং হচ্ছে।
বাসাবাড়িতে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিভু নিভু গ্যাসও থাকছে না। নিরুপায় হয়ে মানুষ হোটেল থেকে চড়া দামে খাবার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, যা সাধারণ মানুষের মাসিক বাজেটের ওপর মরণকামড় বসিয়েছে।
চলমান এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং নগর পরিকল্পনাবিদেরা।
বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়া ও উচ্চ বাতাসের গতির কারণে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (FSRU) জাহাজ ভিড়তে না পারা এবং পূর্ববর্তী যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ না করে সম্পূর্ণভাবে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণেই আজ এই বিপর্যয়।
চট্টগ্রামে ইস্পাত, সিমেন্ট ও পোশাক খাতের মতো ভারী শিল্পগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। দ্রুত সমাধান না হলে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই এবং অর্থনৈতিক ধসের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িক জোড়াতালি দিয়ে এই সংকট কাটবে না। সরকারকে অবিলম্বে দেশীয় স্থলভাগ ও সাগরে গ্যাস উত্তোলনে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি আপদকালীন সংকট মোকাবেলায় চট্টগ্রামে একটি স্থায়ী স্থলভিত্তিক (Land-based) এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা জরুরি। আপাতত সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে গণপরিবহন ও গৃহস্থালির জন্য বিশেষ রেশনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্যাস নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন বিজ্ঞজনেরা।










