আওয়ামী লীগ নেতা ইউনুচ গণির রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা; এলাকায় চাপা ক্ষোভ, আইনি ব্যবস্থার প্রস্তুতি
নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম নগরীর নাছিরাবাদে ধারণ করা সামাজিক সচেতনতামূলক একটি ভিডিও নাটককে (ফিকশন) ‘বাস্তব চাঁদাবাজি’ দাবি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার উদ্দেশ্যে অপপ্রচারের অভিযোগ উঠেছে।
হাটহাজারী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা ইউনুচ গণি চৌধুরী নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক পেইজ থেকে ভিডিওটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিভ্রান্তিকর শিরোনামে প্রচার করায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছেন ছয় তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটর। বর্তমানে তারা বাসা-বাড়িতে থাকতে পারছেন না এবং বিভিন্ন মহল থেকে আইনি ও শারীরিক হেনস্তার শিকার হচ্ছেন বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী তরুণরা জানান, সমাজকে সচেতন করতে ও মানুষের কল্যাণে গত ১ বছর ধরে ‘বড় ভাই ১’ নামক একটি ফেসবুক পেইজ পরিচালনা করছেন মখলেছু রহমান, জাবেদ মন্ডল, ইস্রাফিল, নুরনবী, মামুন ও শামীম নামের ছয় বন্ধু। এই এক বছরে তারা সমাজের বিভিন্ন অসংগতি, শিক্ষামূলক ও আবেগঘন নানা বিষয় নিয়ে ৫০০-র বেশি ভিডিও আপলোড করেছেন, যা দর্শক মহলে বেশ প্রশংসিতও হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীর নাছিরাবাদ এলাকায় চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে তারা একটি পথনাটকের আদলে ভিডিও ধারণ করেন। ভিডিওটি ধারণের দুই ঘণ্টা পর ‘বড় ভাই ১’ পেইজে আপলোড করা হয়।

সচেতনতামূলক এই ফিকশন ভিডিওটি আপলোডের পরপরই ব্যাপক সাড়া জাগায় এবং এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ মানুষ এটি দেখেন ও ৩০ হাজারেরও বেশি শেয়ার হয়। ভিডিওটিতে কোনো সুনির্দিষ্ট এলাকার নাম উল্লেখ ছিল না।

অভিযোগ উঠেছে, গত সরকারের আমলে প্রভাব বিস্তারকারী হাটহাজারী উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ইউনুচ গণি চৌধুরী সাধারণ এই সচেতনতামূলক অভিনয়টিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। বর্তমান সরকারকে বিতর্কিত করা ও নিজের ব্যক্তিগত প্রচারণার উদ্দেশ্যে তিনি ভিডিওটি ডাউনলোড করে নিজের ফেসবুক পেইজে পোস্ট করেন। তিনি ক্যাপশনে সম্পূর্ণ মনগড়া ও উস্কানিমূলকভাবে লেখেন— ‘হাটহাজারী পৌরসভাতে ওপেন চাঁদাবাজি’ এবং ভিডিওর টাইটেল দেন ‘হাটহাজারীতে চলছে ওপেন চাঁদাবাজি’।
এই ঘটনার পর ‘শাহেদ খান’ নামক আরেকটি ফেসবুক পেইজ থেকে ভিডিওর মূল অভিনেতা শামীমের ছবি ও পরিচয় বিকৃত করে উস্কানিমূলক পোস্ট দেওয়া হয়। সেখানে লেখা হয়— “হাটহাজারীতে এই ছেলেকে যেখানেই পাবেন আমাদের খবর দিন। অন্য জেলার ছেলে হয়ে হাটহাজারীতে এসব করে পার পাওয়া যাবে না। ছেলেটাকে যেখানেই পাবেন আইনের হাতে তুলে দিন।”

ইউনুচ গণি চৌধুরী ও শাহেদ খানের পেইজ থেকে এই অপপ্রচারের পর থেকেই দেশজুড়ে চরম হেনস্তা ও হুমকির মুখে পড়েছেন তরুণ ক্রিয়েটররা।
‘বড় ভাই ১’ পেইজের এডমিন মখলেছু রহমান
রহমান অত্যন্ত হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “আমরা সমাজকে সচেতন করতে অত্যন্ত সততার সাথে ১ বছর ধরে কাজ করছি। নাছিরাবাদে করা আমাদের একটি সাজানো অভিনয়কে হাটহাজারীর বাস্তব ঘটনা বলে প্রচার করে ইউনুচ গণি চৌধুরী সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছেন।

আজ আমাদের পুরো টিমকে এলাকাছাড়া হতে হচ্ছে, আমরা বাসায় ঘুমাতে পারছি না। আমরা এই নোংরা অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা জানাই এবং প্রশাসনের কাছে এর বিচার চাই।”
ভিডিওটিতে চাঁদাবাজের চরিত্রে অভিনয় করা তরুণ অভিনেতা শামীম নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “আমি একজন অভিনয়শিল্পী মাত্র। সমাজে ঘটে যাওয়া অসংগতি অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরাই আমার কাজ। আমি কোনো অপরাধী নই। কিন্তু যেভাবে আমার ছবি দিয়ে ‘যেখানেই পাবেন ধরে দিন’ বা ‘পার পাবে না’ বলে উস্কানি দেওয়া হচ্ছে, তাতে যেকোনো মুহূর্তে আমার ওপর হামলা হতে পারে। অন্য জেলার ছেলে বলে আমার নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি প্রশাসনের কাছে আমার জানমালের নিরাপত্তা চাই।”
সচেতন নাগরিক সমাজ ও সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করা তরুণদের এভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বলির পাঁঠা বানানো স্বাধীন কনটেন্ট ক্রিয়েশনের ওপর বড় আঘাত। একটি ফিকশন ভিডিওকে বাস্তব রূপ দিয়ে সামাজিক অস্থিরতা ও সহিংসতা উস্কে দেওয়ার অপরাধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এই বিষয়ে ভুক্তভোগী তরুণরা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে নিশ্চিত করেছেন। তারা চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম ডিভিশন ও স্থানীয় প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।










