ইকবাল উদ্দিন :
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সাবেক কমিশনার ও বর্তমান এপিবিএন প্রধান হাসিব আজিজকে ‘হানিট্র্যাপ’-এ ফেলে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ওঠার পর অবশেষে পাঁচলাইশ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহেদুল ইসলামকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। রোববার সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর সই করা এক জরুরি অফিস আদেশে তাকে মহানগর পুলিশের বিশেষ শাখায় (সিটিএসবি) বদলি করা হয়। একই আদেশে পাঁচলাইশ থানার নতুন ওসি হিসেবে খুলশী থানার বর্তমান ওসি মোজাম্মেল হককে পদায়ন করা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই কেলেঙ্কারির ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, সিএমপির সাবেক পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজের ব্যক্তিগত মুহূর্তের কিছু গোপন ভিডিও ও অডিও ধারণ করে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে তাকে ব্ল্যাকমেইল করে আসছিল। এই অপরাধমূলক চক্রের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাতকানিয়ার নেতা জুবাইরুল হক জিয়ান। অভিযোগ রয়েছে, এই জিয়ানের সঙ্গে সরাসরি যোগসাজশ ছিল সিএমপির দুই প্রভাবশালী ওসির—যাদের একজন পাঁচলাইশের সদ্য বিদায়ী ওসি মো. জাহেদুল ইসলাম এবং অন্যজন ডিবি (দক্ষিণ) বিভাগে কর্মরত বাবুল আজাদ। এর আগে বাবুল আজাদকেও ওসি পদ থেকে সরিয়ে মহানগর গোয়েন্দা বিভাগে বদলি করা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চট্টগ্রাম মহানগরের কোন থানায় কাকে ওসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে কিংবা কাকে কৌশলগত কারণে সরিয়ে দেওয়া হবে, এসব প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রায় দেড় বছর ধরে এই চক্রটি নেপথ্যে থেকে নিয়ন্ত্রণ করত। প্রথমে জিয়ান এবং দুই ওসির সিন্ডিকেট কোন থানায় কাকে পদায়ন করা হবে তার একটি খসড়া তালিকা ও দেনদরবার চূড়ান্ত করত। পদায়ন ও বদলির দেনদরবার চূড়ান্ত হওয়ার পর জিয়ানকে দিয়ে সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজের কাছে ফোন করানো হতো এবং কাঙ্ক্ষিত অফিস আদেশ আদায় করা হতো। গোপন ভিডিও ফাঁসের হুমকি ও ব্ল্যাকমেইলের মুখে তদানীন্তন সিএমপি প্রধান তাদের কাঙ্ক্ষিত অফিস আদেশ বা বদলির ফাইলে সই করতে বাধ্য হতেন। সিএমপির তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই নজিরবিহীন জিম্মি দশার বিষয়টি আঁচ করতে পারলেও মান-সম্মান ও গোপনীয়তা রক্ষার ভয়ে প্রকাশ্যে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাননি।
সম্প্রতি হাসিব আজিজ সিএমপি ছেড়ে এপিবিএন প্রধান হিসেবে যোগদানের পর একটি বিশেষ গোয়েন্দা দল মূল হোতা জিয়ানকে চিহ্নিত করে এবং তার ডিজিটাল ডিভাইস থেকে এই চক্রের ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজির বহু চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ধার করে। এর পরপরই নড়েচড়ে বসে সিএমপি প্রশাসন।
ওসি জাহেদের বদলির আদেশের পাশাপাশি সিএমপির আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ থানায় একযোগে রদবদল করা হয়েছে। সিএমপির অফিস আদেশ অনুযায়ী, কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পুলিশ পরিদর্শক নুর আহমদকে কর্ণফুলী থানার নতুন ওসি করা হয়েছে। কর্ণফুলী থানার বর্তমান ওসি মো. ইখতিয়ার উদ্দিনকে বায়েজিদ বোস্তামি থানায় বদলি করা হয়েছে। সিটিএসবির মোহাম্মদ আবদুর রহিমকে খুলশী থানার নতুন ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ডিবি বন্দর জোনের পুলিশ পরিদর্শক মো. জয়নাল আবেদীন মন্ডলকে হালিশহর থানার ওসি এবং সিটি এসবির মোহাম্মদ একরাম উল্লাহকে সদরঘাট থানার ওসির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই চাঞ্চল্যকর কেলেঙ্কারি ও বদলি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিএমপির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, মহানগরের ছয়টি থানার ওসি পদে রদবদল করা হয়েছে। পুলিশ কমিশনারের এক আদেশে জনস্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সিএমপির বর্তমান প্রশাসন এটিকে অফিশিয়ালি ‘নিয়মিত বদলি ও পদায়নের অংশ’ হিসেবেই দাবি করছে। অন্যদিকে, প্রশাসনের একাধিক গোপন সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এই চক্রের সাথে জড়িত অন্যান্য কর্মকর্তাদের আমলনামাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং অচিরেই তাদের বিরুদ্ধে আরও বড় বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
সিএমপিতে তোলপাড়: ‘হানিট্র্যাপ’ কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত পাঁচলাইশের ওসি জাহেদ বদলি, একযোগে ৬ থানায় রদবদল
জনপ্রিয় সংবাদ










