শাহাদাত হোসাইন
‘আল্লাহু, আল্লাহু’ জিকিরের গগনবিদারী ধ্বনি আর লাখো আশেক-ভক্তের চোখের জলে প্রকম্পিত পুরো ফটিকছড়ির আধ্যাত্মিক নগরী। চতুর্দিকে হাজারো মোমের আলো আর সুবাসিত আগরবাতির ধোঁয়ায় তৈরি হওয়া এক অপার্থিব স্বর্গীয় পরিবেশ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লাখো ভক্তের অশ্রুসিক্ত নয়নে সম্পন্ন হলো গাউছুল আজম হযরত শাহছুফি মাওলানা সৈয়দ গোলামুর রহমান প্রকাশ বাবাভাণ্ডারী (ক.)-এর ১৬৪তম পবিত্র খোশরোজ শরীফ ।
গত ১৪ অক্টোবর (বুধবার) দিবাগত রাতে দরবার শরীফের আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী এই আধ্যাত্মিক মহাসম্মেলনের সফল সমাপ্তি ঘটে।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের মূল কেন্দ্রবিন্দু থেকে শুরু করে নাজিরহাট পর্যন্ত প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়।
বাবাভাণ্ডারীর সর্বজনীন সুফি দর্শনের টানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের এই একাত্মতার চিত্র ছিল চোখ পড়ার মতো । এই মহোৎসবকে কেন্দ্র করে প্রধান ও ঐতিহ্যবাহী রহমানিয়া মঞ্জিলসহ বাবাভাণ্ডারীর সন্তানদের ও ভাইদের নামীয় মঞ্জিলসমূহের আলাদা আলাদা আধ্যাত্মিক ও সামাজিক উৎসবের আমেজ ছিল।
মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের আদি এবং প্রধান কেন্দ্রবিন্দু পবিত্র গাউছিয়া আহমদিয়া মঞ্জিলে সাজ্জাদানশীনে দরবারে গাউছুল আজম আলহাজ্ব হযরত মওলানা শাহ সুফি সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী এবং নায়েব সাজ্জাদানশীন সৈয়দ ইরফানুল হক মাইজভাণ্ডারীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে খোশরোজ শরীফ উপলক্ষে এখানে মূল ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এই মঞ্জিলের শাহী ময়দানে আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে গাউছে মাইজভাণ্ডারীর উদ্যোগে বিশাল প্রস্তুতি সভা, দিনরাত খতমে কোরআন, খতমে খাজেগান, মিলাদ মাহফিল এবং জিকিরের আসর বসে। দেশ-বিদেশের লাখ লাখ আশেক এই মঞ্জিলের প্রধান ভাণ্ডারখানায় ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে তবারক গ্রহণ করেন।
খোশরোজ শরীফের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল গাউছিয়া রহমানিয়া মঞ্জিল ও আশেকানে মাইজভাণ্ডারী এসোসিয়েশনের বর্ণিল আয়োজন এই মঞ্জিলের সাজ্জাদানশীন, লাখো ভক্তের প্রাণপ্রিয় মুর্শিদ হযরত শাহ্সুফি মাওলানা সৈয়দ মুজিবুল বশর আল্–হাসানী আল–মাইজভাণ্ডারী আসরের নামাজের পর শাহী ময়দানে লাখো ভক্তের উপস্থিতিতে প্রধান আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন। এই মঞ্জিলে তিন দিনব্যাপী বিশেষ ত্বরিকত আলোচনা এবং ভক্তদের আধ্যাত্মিক সাক্ষাৎ ও তবারক বিতরণের ব্যাপক ব্যবস্থা করা হয়।
দরবারের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র মইনীয়া রহমান মঞ্জিল। এই মঞ্জিলের সাজ্জাদানশীন শাহজাদায়ে গাউছুল আযম সাইয়্যিদ ড. সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী ওয়াল হোসাইনী এর নেতৃত্বে বিশেষ ত্বরিকত সম্মেলন ও আধ্যাত্মিক ছেমা মাহফিলের আয়োজন করা হয়। সাইফউদ্দীন বাবার বিশ্বশান্তি, মানবিক মূল্যবোধ ও সম্প্রীতির নসিহত শুনতে এই মঞ্জিলে ভক্তদের ঢল নামে। এখান থেকে মাদক ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতার বার্তা দেওয়া হয়।
বাবাভাণ্ডারীর পবিত্র বংশধর, প্রাজ্ঞ সুফি সাধক শাহজাদা শাহছুফি সৈয়দ শহিদুদ্দিন আহমদ মাইজভাণ্ডারী -এর সুশৃঙ্খল দিকনির্দেশনায় তাঁর নিজস্ব মঞ্জিল প্রাঙ্গণে হাজার হাজার আশেকের জন্য বিশেষ ত্বরিকত বয়ান, মিলাদ মাহফিল ও জিকিরের আসর বসে। দূর-দূরান্ত থেকে আগত ভক্তদের আধ্যাত্মিক দীক্ষা ও রওজা শরীফ জিয়ারতের সার্বিক দেখভাল করেন তাঁর স্বেচ্ছাসেবক দল।
বিশ্বঅলি শাহানশাহ্ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র গাউছিয়া হক মঞ্জিলে ছিল ভক্তদের বাঁধভাঙা জোয়ার। এই মঞ্জিলের সাজ্জাদানশীন হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে খতমে কোরআন, খতমে গাউছিয়া ও বিশ্বশান্তির লক্ষ্যে বিশেষ জিকিরের আসর বসে ।
এছাড়াও বাবাভাণ্ডারীর ভাইদের স্মৃতিবিজড়িত ওহাব মঞ্জিলে দিনরাত চলেছে বিশেষ দরূদ শরীফ পাঠ, মিলাদ মাহফিল ও ছেমা মাহফিল। দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রবীণ আশেকরা রওজা পাক জিয়ারত করে চোখের জলে নিজেদের আত্মশুদ্ধি কামনা করেন। অপরদিকে কাশেম মঞ্জিলে খোশরোজ শরীফ উপলক্ষে সুফিবাদ ও ত্বরিকত চর্চার ওপর বিশেষ ধর্মীয় আলোচনার আয়োজন করা হয়। সোবহান মঞ্জিল এবং হাদি মঞ্জিল জুড়ে ছিল ভক্তদের সেবার অনন্য নজির। এই দুই মঞ্জিলের উদ্যোগে কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবক দিনরাত কাজ করেছেন। খালেক মঞ্জিল ও দেলোয়ার মঞ্জিলে আসা হাজারো ভক্তের শৃঙ্খলা ছিল চোখ পড়ার মতো। খালেক মঞ্জিলের পক্ষ থেকে আগত আশেকদের সুশৃঙ্খল ভাবে জিয়ারত সম্পন্ন করার পাশাপাশি বিশেষ দোয়ার মাহফিল ও তবারক বিতরণের সুব্যবস্থা করা হয়। অপরদিকে, দেলোয়ার মঞ্জিল ও আমিন মঞ্জিলের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দল প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ভক্তদের নির্বিঘ্নে রওজা শরীফ জিয়ারতের সুযোগ করে দিতে দিনরাত নিরলস পরিশ্রম করেন।
মহোৎসবের তিন দিনে দরবার শরীফের সব মঞ্জিল মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজারেরও বেশি চুলোয় রান্না করা হয় বিশেষ তবারক এবং ৪ হাজারেরও বেশি বাবুর্চি ও সেবক নিরলসভাবে আগত মেহমানদের সেবা করেন । ফটিকছড়ি উপজেলা প্রশাসন ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের বিশেষ তৎপরতায় পুরো দরবার এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণে এনে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।
স্বেচ্ছাসেবকদের সুশৃঙ্খল দায়িত্ব পালনের কারণে কোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই তিন দিনব্যাপী এই মহাসম্মেলন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়। দিবাগত শেষ রাতে যখন মোনাজাত শেষ হয়, তখন ভক্তদের চোখে ছিল বিদায়ের অশ্রু আর অন্তরে ছিল বাবাভাণ্ডারীর প্রতি গভীর প্রেম ও ভক্তি। ভোর হতেই আশেকরা আবার শান্তির বার্তা বুকে নিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরতে শুরু করেন।












