ঢাকা ১০:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজারে কাঠের রিসোর্টে প্রলয়ংকরী আগুন: একই পরিবারের শিশুসহ ১০ পর্যটক জীবন্ত দগ্ধ

  • আপডেট সময় : ১২:১৪:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
  • 15

ভোরের ঘুমে ইনানীতে ট্র্যাজেডি • ফায়ার লাইসেন্স ছাড়াই চলত বাঁশ-কাঠের তিনতলা কাঠামো • জেলা প্রশাসনের ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি

‎
‎বিশেষ প্রতিনিধি
‎
‎ভোরের আলো ফুটে ওঠার মুখে সমুদ্রের শান্ত হাওয়া তখন সবেমাত্র ছুঁয়ে যাচ্ছিল ইনানী সৈকত। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি শেষে কাঠের তৈরি নান্দনিক রিসোর্টটিতে গভীর ঘুমে মগ্ন ছিলেন পর্যটকরা। ঠিক তখনই চিরচেনা সেই ছুটির আনন্দ রূপ নিল এক বিভীষিকাময় নরককুণ্ডে। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানীর পাটোয়ারটেক সৈকত সংলগ্ন বাঁশ ও কাঠের তৈরি তিনতলা বিশিষ্ট ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্ট’-এ এক প্রলয়ংকরী অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন পর্যটক জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারেরই সদস্য অন্তত ৮ জন, যার মধ্যে রয়েছে নিষ্পাপ শিশুও।
‎
‎আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল আনুমানিক সাড়ে ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা, রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি অথবা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। সম্পূর্ণ কাঠ ও বাঁশের কাঠামো হওয়ায় এবং সমুদ্রের তীব্র বাতাসের কারণে চোখের পলকে আগুন পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। ঘুমন্ত পর্যটকদের বের হওয়ার কোনো সুযোগ না দিয়েই মুহূর্তের মধ্যে রিসোর্টটি জ্বলন্ত কয়লায় পরিণত হয়।
‎
‎
‎এই ট্র্যাজেডিতে সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছে ঢাকার এক বেড়াতে আসা পরিবারের ওপর। পরিবারের এক প্রবীণ সদস্য বুক ফাটা আর্তনাদ করে বলেন, “আমার তিন বোনের পাঁচ ছেলে-মেয়ে মারা গেছে। ওরা ৯ জন একসঙ্গে আনন্দ করতে বেড়াতে এসেছিল, এখন সব শেষ।
‎
‎নিহত ১০ জনের মধ্যে ৬ জনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তারা হলেন— ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও মাত্র ৫ বছর বয়সী শিশু ফায়িজান আহম্মেদ। বাকি চারজনের মরদেহ এতটাই পুড়ে বিকৃত হয়ে গেছে যে, ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
‎
‎এছাড়া দগ্ধ ও আহত আরও অন্তত ৬ জনকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে মুগদা মেডিকেল কলেজের একজন চিকিৎসক ও তাঁর স্ত্রী রয়েছেন, যাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
‎
‎
‎হৃদয়বিদারক এই ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের আবাসন খাতের চরম গাফিলতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গণমাধ্যমকে জানান, পুড়ে যাওয়া রিসোর্টটির কোনো বৈধ ফায়ার লাইসেন্স ছিল না। এমনকি বহুতল এই কাঠের ভবনে অগ্নিনির্বাপণের জন্য ন্যূনতম কোনো প্রাথমিক সরঞ্জাম বা জরুরি বহির্গমন পথ (Emergency Exit) ছিল না। সম্পূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণভাবে এবং নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয়েছিল এই বিনোদন কেন্দ্রটি।
‎
‎
‎ঘটনার পরপরই জেলা প্রশাসন, পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং প্রশাসনের চোখের সামনে কীভাবে এমন অবৈধ কাঠামো চলছিল, তা খতিয়ে দেখতে ৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
‎
‎এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো পর্যটন নগরীসহ দেশজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। নিরাপদ পর্যটনের স্বার্থে মেরিন ড্রাইভসহ কক্সবাজারের সমস্ত অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টগুলোর বিরুদ্ধে এখনই চিরুনি অভিযান চালানোর জোর দাবি তুলেছেন পর্যটক ও স্থানীয় সচেতন মহল।
‎
‎

৫০০ কোটি টাকার ঐতিহাসিক স্টার্টআপ তহবিল ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

কক্সবাজারে কাঠের রিসোর্টে প্রলয়ংকরী আগুন: একই পরিবারের শিশুসহ ১০ পর্যটক জীবন্ত দগ্ধ

আপডেট সময় : ১২:১৪:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

ভোরের ঘুমে ইনানীতে ট্র্যাজেডি • ফায়ার লাইসেন্স ছাড়াই চলত বাঁশ-কাঠের তিনতলা কাঠামো • জেলা প্রশাসনের ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি

‎
‎বিশেষ প্রতিনিধি
‎
‎ভোরের আলো ফুটে ওঠার মুখে সমুদ্রের শান্ত হাওয়া তখন সবেমাত্র ছুঁয়ে যাচ্ছিল ইনানী সৈকত। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি শেষে কাঠের তৈরি নান্দনিক রিসোর্টটিতে গভীর ঘুমে মগ্ন ছিলেন পর্যটকরা। ঠিক তখনই চিরচেনা সেই ছুটির আনন্দ রূপ নিল এক বিভীষিকাময় নরককুণ্ডে। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানীর পাটোয়ারটেক সৈকত সংলগ্ন বাঁশ ও কাঠের তৈরি তিনতলা বিশিষ্ট ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্ট’-এ এক প্রলয়ংকরী অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন পর্যটক জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারেরই সদস্য অন্তত ৮ জন, যার মধ্যে রয়েছে নিষ্পাপ শিশুও।
‎
‎আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল আনুমানিক সাড়ে ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা, রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি অথবা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। সম্পূর্ণ কাঠ ও বাঁশের কাঠামো হওয়ায় এবং সমুদ্রের তীব্র বাতাসের কারণে চোখের পলকে আগুন পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। ঘুমন্ত পর্যটকদের বের হওয়ার কোনো সুযোগ না দিয়েই মুহূর্তের মধ্যে রিসোর্টটি জ্বলন্ত কয়লায় পরিণত হয়।
‎
‎
‎এই ট্র্যাজেডিতে সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছে ঢাকার এক বেড়াতে আসা পরিবারের ওপর। পরিবারের এক প্রবীণ সদস্য বুক ফাটা আর্তনাদ করে বলেন, “আমার তিন বোনের পাঁচ ছেলে-মেয়ে মারা গেছে। ওরা ৯ জন একসঙ্গে আনন্দ করতে বেড়াতে এসেছিল, এখন সব শেষ।
‎
‎নিহত ১০ জনের মধ্যে ৬ জনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তারা হলেন— ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও মাত্র ৫ বছর বয়সী শিশু ফায়িজান আহম্মেদ। বাকি চারজনের মরদেহ এতটাই পুড়ে বিকৃত হয়ে গেছে যে, ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
‎
‎এছাড়া দগ্ধ ও আহত আরও অন্তত ৬ জনকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে মুগদা মেডিকেল কলেজের একজন চিকিৎসক ও তাঁর স্ত্রী রয়েছেন, যাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
‎
‎
‎হৃদয়বিদারক এই ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের আবাসন খাতের চরম গাফিলতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গণমাধ্যমকে জানান, পুড়ে যাওয়া রিসোর্টটির কোনো বৈধ ফায়ার লাইসেন্স ছিল না। এমনকি বহুতল এই কাঠের ভবনে অগ্নিনির্বাপণের জন্য ন্যূনতম কোনো প্রাথমিক সরঞ্জাম বা জরুরি বহির্গমন পথ (Emergency Exit) ছিল না। সম্পূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণভাবে এবং নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয়েছিল এই বিনোদন কেন্দ্রটি।
‎
‎
‎ঘটনার পরপরই জেলা প্রশাসন, পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং প্রশাসনের চোখের সামনে কীভাবে এমন অবৈধ কাঠামো চলছিল, তা খতিয়ে দেখতে ৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
‎
‎এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো পর্যটন নগরীসহ দেশজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। নিরাপদ পর্যটনের স্বার্থে মেরিন ড্রাইভসহ কক্সবাজারের সমস্ত অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টগুলোর বিরুদ্ধে এখনই চিরুনি অভিযান চালানোর জোর দাবি তুলেছেন পর্যটক ও স্থানীয় সচেতন মহল।
‎
‎