ঢাকা ০৬:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধ্বংসস্তূপে লাতিন আমেরিকার প্রাচীন জনপদ: কলম্বিয়ায় শতাব্দীর ভয়াবহতম ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ১৩২, দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা

  • আপডেট সময় : ০৩:৩৬:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
  • 17

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :


‎লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানা স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ও শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩২ জনে দাঁড়িয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো শত শত মানুষ নিখোঁজ থাকায় উদ্ধারকাজে নিয়োজিত কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে যে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে আঘাত হানা ৭.৪ মাত্রার এই প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে পুরো দেশ, যার রেশ প্রতিবেশী ইকুয়েডর পর্যন্ত অনুভূত হয়েছে। আকস্মিক এই মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় কলম্বিয়ার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা দেশজুড়ে ‘জাতীয় জরুরি বিপর্যয় অবস্থা’ ঘোষণা করেছেন।


‎মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) এবং কলম্বিয়ার ভূ-তাত্ত্বিক সংস্থার যৌথ তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে ৭.৪ মাত্রার এই ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল দেশটির প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চল চোকো-র সান হোসে দেল পালমার পৌরসভা থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার পূর্বে। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০৭ কিলোমিটার গভীরে এই কম্পনের সৃষ্টি হলেও এর তীব্রতা ও বিস্তৃতি ছিল নজিরবিহীন। কলম্বিয়ার সরকারি ভূ-তাত্ত্বিক সংস্থা এটিকে একুশ শতকে দেশটির ইতিহাসে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে অভিহিত করেছে। মূল ভূকম্পনের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টায় ওই অঞ্চলে অন্তত ২১টি শক্তিশালী ‘আফটারশক’ বা পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ ৪.৮ মাত্রা পর্যন্ত কম্পন ছিল। ঘন ঘন এই পরাঘাতের ফলে উপদ্রুত এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং অনেকেই খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন।


‎ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কলম্বিয়ার বিখ্যাত কফি উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত পশ্চিমাঞ্চলীয় রিসারালদা প্রদেশে। এখানকার স্থানীয় প্রশাসন এখন পর্যন্ত কেবল এই একটি প্রদেশেই ৪২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। এছাড়া ভ্যালে দে কাউকা অঞ্চলে ২৭ জন এবং উৎপত্তিস্থল চোকো অঞ্চলে ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

‎দেশটির অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও জনবহুল শহর ক্যালিতে অন্তত ২০টি বহুতল ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে এবং ৩৮০টিরও বেশি স্থাপনা আংশিক বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্যালির একটি প্রধান হাসপাতালের শিশু ও নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রটি ধসে পড়ায় সেখানে উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে। অন্যদিকে, মানিজালেস শহরের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহাসিক ক্যাথেড্রালের বিশাল টাওয়ারটি ভেঙে পড়ার দৃশ্য স্থানীয়দের মাঝে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। সরকারি প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে ১ হাজার ৫৭৫টি ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৬১টি ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।


‎ভূমিকম্পের পরপরই দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (Aerocivil) রানওয়ে এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারগুলোর কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে পেরেইরা, মানিজালেস, কুইবদো, আর্মেনিয়া, কার্তাগো এবং বুয়েনাভেনচুরা বিমানবন্দরের সমস্ত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। রাস্তাঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়া এবং বহু জায়গায় ভূমিধসের কারণে দুর্গম এলাকাগুলোতে ভারী উদ্ধারকারী যানবাহন পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে। তবে ভেঙে পড়া কংক্রিটের স্তূপের ভেতর থেকে জীবনের স্পন্দন খুঁজে বের করতে স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মীরা সম্মিলিতভাবে কাজ করছেন।

‎রাষ্ট্রীয় তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক সংহতি
‎বোগোতার প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসে ক্যাপিটাল সিটিস অ্যাসোসিয়েশন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, “পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হলেও রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে রয়েছে।” জরুরি অবস্থা জারির ফলে এখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই উপদ্রুত অঞ্চলের মানুষের জন্য বিশেষ ত্রাণ তহবিল ও সামরিক বাহিনীকে উদ্ধারকাজে সরাসরি মোতায়েন করা সম্ভব হচ্ছে।

‎এই চরম সংকটে কলম্বিয়ার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জরুরি মানবিক সহায়তা হিসেবে ১৫.৫ মিলিয়ন ডলারের তহবিল ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের বিশেষায়িত ‘কোপারনিকাস’ স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কলম্বিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের রিয়েল-টাইম মানচিত্র তৈরি করে উদ্ধারকারী সংস্থাকে সাহায্য করছে। লাতিন আমেরিকার প্রতিবেশী রাষ্ট্র মেক্সিকো, এল সালভাদর, চিলি এবং ইকুয়েডর ইতিমধ্যেই তাদের নিজস্ব বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল ও জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী। সূত্র : সিএনএন

চিকিৎসাধীন যুবদল নেতার পাশে কেন্দ্রীয় সভাপতি মুন্নাসহ চট্টগ্রামের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ

ধ্বংসস্তূপে লাতিন আমেরিকার প্রাচীন জনপদ: কলম্বিয়ায় শতাব্দীর ভয়াবহতম ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ১৩২, দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা

আপডেট সময় : ০৩:৩৬:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :


‎লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানা স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ও শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩২ জনে দাঁড়িয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো শত শত মানুষ নিখোঁজ থাকায় উদ্ধারকাজে নিয়োজিত কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে যে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে আঘাত হানা ৭.৪ মাত্রার এই প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে পুরো দেশ, যার রেশ প্রতিবেশী ইকুয়েডর পর্যন্ত অনুভূত হয়েছে। আকস্মিক এই মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় কলম্বিয়ার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা দেশজুড়ে ‘জাতীয় জরুরি বিপর্যয় অবস্থা’ ঘোষণা করেছেন।


‎মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) এবং কলম্বিয়ার ভূ-তাত্ত্বিক সংস্থার যৌথ তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে ৭.৪ মাত্রার এই ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল দেশটির প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চল চোকো-র সান হোসে দেল পালমার পৌরসভা থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার পূর্বে। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০৭ কিলোমিটার গভীরে এই কম্পনের সৃষ্টি হলেও এর তীব্রতা ও বিস্তৃতি ছিল নজিরবিহীন। কলম্বিয়ার সরকারি ভূ-তাত্ত্বিক সংস্থা এটিকে একুশ শতকে দেশটির ইতিহাসে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে অভিহিত করেছে। মূল ভূকম্পনের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টায় ওই অঞ্চলে অন্তত ২১টি শক্তিশালী ‘আফটারশক’ বা পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ ৪.৮ মাত্রা পর্যন্ত কম্পন ছিল। ঘন ঘন এই পরাঘাতের ফলে উপদ্রুত এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং অনেকেই খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন।


‎ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কলম্বিয়ার বিখ্যাত কফি উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত পশ্চিমাঞ্চলীয় রিসারালদা প্রদেশে। এখানকার স্থানীয় প্রশাসন এখন পর্যন্ত কেবল এই একটি প্রদেশেই ৪২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। এছাড়া ভ্যালে দে কাউকা অঞ্চলে ২৭ জন এবং উৎপত্তিস্থল চোকো অঞ্চলে ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

‎দেশটির অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও জনবহুল শহর ক্যালিতে অন্তত ২০টি বহুতল ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে এবং ৩৮০টিরও বেশি স্থাপনা আংশিক বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্যালির একটি প্রধান হাসপাতালের শিশু ও নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রটি ধসে পড়ায় সেখানে উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে। অন্যদিকে, মানিজালেস শহরের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহাসিক ক্যাথেড্রালের বিশাল টাওয়ারটি ভেঙে পড়ার দৃশ্য স্থানীয়দের মাঝে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। সরকারি প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে ১ হাজার ৫৭৫টি ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৬১টি ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।


‎ভূমিকম্পের পরপরই দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (Aerocivil) রানওয়ে এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারগুলোর কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে পেরেইরা, মানিজালেস, কুইবদো, আর্মেনিয়া, কার্তাগো এবং বুয়েনাভেনচুরা বিমানবন্দরের সমস্ত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। রাস্তাঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়া এবং বহু জায়গায় ভূমিধসের কারণে দুর্গম এলাকাগুলোতে ভারী উদ্ধারকারী যানবাহন পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে। তবে ভেঙে পড়া কংক্রিটের স্তূপের ভেতর থেকে জীবনের স্পন্দন খুঁজে বের করতে স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মীরা সম্মিলিতভাবে কাজ করছেন।

‎রাষ্ট্রীয় তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক সংহতি
‎বোগোতার প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসে ক্যাপিটাল সিটিস অ্যাসোসিয়েশন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, “পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হলেও রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে রয়েছে।” জরুরি অবস্থা জারির ফলে এখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই উপদ্রুত অঞ্চলের মানুষের জন্য বিশেষ ত্রাণ তহবিল ও সামরিক বাহিনীকে উদ্ধারকাজে সরাসরি মোতায়েন করা সম্ভব হচ্ছে।

‎এই চরম সংকটে কলম্বিয়ার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জরুরি মানবিক সহায়তা হিসেবে ১৫.৫ মিলিয়ন ডলারের তহবিল ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের বিশেষায়িত ‘কোপারনিকাস’ স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কলম্বিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের রিয়েল-টাইম মানচিত্র তৈরি করে উদ্ধারকারী সংস্থাকে সাহায্য করছে। লাতিন আমেরিকার প্রতিবেশী রাষ্ট্র মেক্সিকো, এল সালভাদর, চিলি এবং ইকুয়েডর ইতিমধ্যেই তাদের নিজস্ব বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল ও জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী। সূত্র : সিএনএন