বিশেষ প্রতিনিধি
কোনো স্বাগত তোরণ নেই। নেই কোনো চটকদার বিলবোর্ড বা সুবিশাল প্যানাফ্লেক্স। এমনকি চিরচেনা রাজনৈতিক শো-ডাউনের সেই চেনা স্লোগান বা মাইকের কানফাটানো আওয়াজও উধাও। বাংলাদেশের প্রথাগত ভিআইপি সংস্কৃতির খোলনলচে বদলে দিয়ে আগামীকাল ৯ আগস্ট (রোববার) দেশের শীর্ষ প্রশাসনিক দায়িত্বে বসার পর প্রথমবার বৃহত্তর চট্টগ্রামে পা রাখছেন তারেক রহমান। তাঁর এই সফরকে ঘিরে বন্দরনগরী ও এর আশপাশের উপজেলাগুলোতে তৈরি হয়েছে এক সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী আবহ, যা দেশের গতানুগতিক রাজনৈতিক ধারা থেকে একদম আলাদা।
সাধারণত কোনো সরকারপ্রধানের প্রথম জেলা সফর মানেই যেখানে কোটি টাকার প্রচারণামূলক অপচয়, রাস্তাঘাট বন্ধ আর সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ—সেখানে চট্টগ্রামের রাজপথ সম্পূর্ণ ফাঁকা ও সুশৃঙ্খল। প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনার পর স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্যানার-পোস্টারের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে এসেছেন।
সফরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি জমবে সন্ধ্যায় নগরীর পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুর রুদ্ধদ্বার কক্ষে। কোনো খোলা মাঠের উন্মুক্ত জনসভা বা কৃত্রিম শক্তির মহড়া নয়, বরং চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাসহ ১১টি অঙ্গ-সংগঠনের পদধারীদের নিয়ে একটি বিশেষ সাংগঠনিক সভা করবেন তিনি।
এই সভায় কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা প্রভাবশালী নেতার ‘সুপারিশ’ খাটবে না। নির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে কেবল ত্যাগী ও মাঠপর্যায়ের নেতারাই সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সামনে বসার সুযোগ পাচ্ছেন।
দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে এই ইনডোর বৈঠকটি একটি ‘শুদ্ধি অভিযান’ হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রাজনৈতিক মাঠ গরম করার চেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে অতি সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
আগামীকাল দুপুর ১২টায় হেলিকপ্টারযোগে বাঁশখালীর বাহারছড়া সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছাবেন তিনি। সেখানে কেবল নামমাত্র ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ নয়, বরং বন্যায় পুরোপুরি ঘরহারা ১০০টি নিস্ব পরিবারের হাতে সরাসরি নতুন স্থায়ী পুনর্বাসন বাড়ির চাবি হস্তান্তর করবেন।
এরপর হাটহাজারী সরকারি কলেজ মাঠে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের উদ্যোগে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৩০টি পরিবারকে নতুন ঘর তোলার জন্য ১ লাখ টাকা করে নগদ অর্থ এবং ১৫ জন প্রতিবন্ধীকে বিশেষ আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের আরেকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো দেশের কওমি মাদ্রাসা ও বৃহৎ ধর্মীয় শক্তির সাথে সম্পর্কের এক নতুন সমীকরণ তৈরি করা।
দুপুর ১টায় তিনি ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় যাবেন। সেখানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে তাঁর একটি একান্ত সৌজন্য সাক্ষাৎ হওয়ার কথা রয়েছে।
:এরপর তিনি হাটহাজারীর বড় মাদ্রাসায় গিয়ে মরহুম আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর কবর জিয়ারত করবেন। রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ নেতৃত্বের প্রতি এই প্রকাশ্য শ্রদ্ধা প্রদর্শন দেশের সামাজিক ও ধর্মীয় স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে একটি সুদূরপ্রসারী বার্তা দিচ্ছে।
রাজনৈতিক ও মানবিক কর্মসূচির পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী দেশের ব্লু-ইকোনমি বা সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। আজ সকালে সফরের শুরুতেই তিনি কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে চলমান গভীর সমুদ্র বন্দরসহ বিভিন্ন মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি নিজে দাঁড়িয়ে তদারকি করবেন।
কোনো রাজনৈতিক জাঁকজমক বা তোরণ না থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর সার্বিক নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় কোনো কমতি রাখেনি স্থানীয় প্রশাসন। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব সংস্থা অত্যন্ত সুচারুভাবে সমন্বিত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে। হেলিপ্যাড নির্মাণসহ প্রতিটি স্পটের সব ধরনের প্রশাসনিক কাজ শতভাগ সম্পন্ন।
রাত ৯টা ২০ মিনিটে সমস্ত কর্মসূচি শেষ করে ঢাকার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম ত্যাগ করবেন তারেক রহমান। তবে বাহ্যিক শোরগোলহীন এই সফরটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যানার-পোস্টারবিহীন, সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিতামূলক রাজনীতির এক নতুন যুগের সূচনা ঘটিয়ে দিল—যা অন্য সব দলের জন্যও একটি বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে।











