ঢাকা ১২:০৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৩৬ জুলাই: একটি অবিনাশী প্রতীক ও নতুন বাংলাদেশের মহাকাব্য

  • আপডেট সময় : ০৪:৪৬:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
  • 46

রাসেল চৌধুরী :

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টালে ৩১ জুলাইয়ের পর স্বাভাবিক নিয়মেই আসে ১ আগস্ট। কিন্তু ২০২৪ সালের বাংলাদেশে ইতিহাসের নিজস্ব এক ক্যালেন্ডার তৈরি হয়েছিল, যেখানে আগস্টের ৫ তারিখটিকে ছাত্র-জনতা চিনেছে ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে। ৩৬ জুলাই কোনো সাধারণ তারিখ নয়, এটি একটি রূপক, একটি অবিনাশী স্মারক এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরাচারী শাসনের পতনের প্রতীক।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন একপর্যায়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, তখন ছাত্র-জনতা প্রতিজ্ঞা করেছিল—যতক্ষণ না পর্যন্ত এই দেশের মানুষের মুক্তি আসবে, ততক্ষণ জুলাই মাস শেষ হবে না।

এই ‘জুলাই শেষ না হওয়ার’ প্রতীকী স্পৃহাই ৫ আগস্টকে ইতিহাসে ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে অমর করে তুলেছে।আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও উত্তাল জুলাই২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট কর্তৃক ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কোটা সংস্কার আন্দোলন পুনরায় মাথাচারা দিয়ে ওঠে।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা বৈষম্যহীন একটি মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের দাবিতে শান্তিপূর্ণ উপায়ে রাজপথে নেমে আসে। কিন্তু তৎকালীন অনির্বাচিত ও স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকার শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক দাবিকে চরম অবজ্ঞা করে। আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে কটূক্তি করা হয়, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আত্মসম্মানে চরম আঘাত হানে।

১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ যখন বুক চিতিয়ে পুলিশের বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে শহীদ হন, তখন পুরো দেশের মানুষের ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়।

আবু সাঈদের সেই বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ এবং পরবর্তীতে মীর মুগ্ধের ‘পানি লাগবে, কারো পানি লাগবে?’ বলতে বলতে চিরবিদায় নেওয়ার ঘটনা কোটি কোটি মানুষকে ঘরের বাইরে টেনে আনে। পুলিশ, র‍্যাব এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনগুলোর নির্মম বুলেটের আঘাতে প্রায় দেড় হাজার ছাত্র-জনতা শহীদ হন এবং হাজার হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেন। মৃত্যুর এই দীর্ঘ মিছিল দেখে কোটা সংস্কারের আন্দোলন এক দফায়—অর্থাৎ স্বৈরাচারের পদত্যাগের আন্দোলনে পরিণত হয়।‘৩৬ জুলাই’ ধারণার জন্ম ও এর সামাজিক-সাংস্কৃতিক অর্থরাষ্ট্রীয় বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের ব্যাপক দমন-পীড়ন, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, সান্ধ্য আইন (কারফিউ) এবং গণগ্রেপ্তারের মুখেও আন্দোলনকারীরা পিছু হঠেনি। আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সাধারণ নাগরিকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দেন—বিজয় না আসা পর্যন্ত জুলাই মাস শেষ হতে দেওয়া হবে না। তারা ক্যালেন্ডারের আগস্ট মাসের দিনগুলোকে জুলাইয়ের বর্ধিত অংশ হিসেবে গণনা করা শুরু করেন।

১ আগস্ট হয়ে ওঠে ৩২ জুলাই, ২ আগস্ট ৩৩ জুলাই—এভাবে ক্রমান্বয়ে ৫ আগস্ট রূপ নেয় ‘৩৬ জুলাই’-এ।

সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, ৩৬ জুলাই হলো এক চমৎকার ‘নাগরিক কল্পনা’ (Civic Imagination)। এটি এমন এক যৌথ রাজনৈতিক স্মৃতি, যেখানে একটি দেশের নাগরিকেরা স্বৈরাচারের চাপিয়ে দেওয়া ভয়ের সংস্কৃতিকে ভাঙার জন্য সময় ও ক্যালেন্ডারকে নিজেদের মতো করে পুনর্নির্মাণ করে নেন।

অধ্যাপক ও গবেষকদের মতে, ৩৬ জুলাইয়ের মাধ্যমে দেশের মানুষের মন থেকে দীর্ঘ দুই দশকের ভয়ের শাসন এক নিমেষেই উবে গিয়েছিল। এটি হয়ে উঠেছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ জয়ের হাতিয়ার।

৫ আগস্ট তথা ৩৬ জুলাইয়ের চূড়ান্ত মহাবিজয়২০২৪ সালের ৫ আগস্ট (৩৬ জুলাই) আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ বা ঢাকা অভিমুখে যাত্রার ডাক দেওয়া হয়। দেশের আনাচ-কানাচ থেকে লাখ লাখ মানুষ সব ধরনের ভয়-ভীতি, কারফিউ ও বুলেটের তোয়াক্কা না করে রাজধানী ঢাকার দিকে ধেয়ে আসে।

ছাত্র-জনতার এই বাঁধভাঙা জোয়ার দেখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুপুর নাগাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান।শেখ হাসিনার পতনের সাথে সাথে দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এক স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসান ঘটে। ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে লাখ লাখ মানুষের ঢল। অচেনা মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আনন্দের কান্না কান্দে, মিষ্টি বিতরণ করা হয় এবং রাজপথে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ছাত্ররা নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়।

ঢাকার দেয়ালগুলো রাতারাতি রূপ নেয় এক রঙিন ক্যানভাসে, যেখানে গ্রাফিতির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয় সাম্য, স্বাধীনতা এবং বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন।৩৬ জুলাইয়ের তাৎপর্য ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ৩৬ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় স্বাধীনতা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এটি শুধু একটি সরকারের পরিবর্তন নয়, বরং এটি ছিল পুরো রাষ্ট্রকাঠামোর দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক গণজাগরণ। তবে স্বৈরাচারের পতনের পরই একটি টেকসই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করা সহজ কাজ নয়। দীর্ঘ বছরের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে দেশের বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভীষণভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

৩৬ জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হলে আমাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে:১. প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার: দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিচার বিভাগ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করা।

২. মানবাধিকার ও জবাবদিহিতা: জুলাই অভ্যুত্থানে যারা সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে, তাদের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচারের আওতায় আনা।

৩. বৈষম্যহীন সমাজ গঠন: মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুসহ প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার রক্ষা করা।

৪. ভয়ের সংস্কৃতির চিরতরে অবসান: ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি এবং টর্চার সেলের মতো নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার স্থায়ী অবসান ঘটানো।উপসংহার৩৬ জুলাই কোনো সাধারণ দিন নয়; এটি আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, ওয়াসিম, প্রিয়াদের মতো শত শত শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এক নতুন ভোরের নাম। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, দেশের সাধারণ ছাত্র-জনতা যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন কোনো বুলেট বা স্বৈরাচারী শক্তি তাদের দাবিয়ে রাখতে পারে না।

৩৬ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিনাশী স্মারক হিসেবে টিকে থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চিরন্তন প্রেরণা জুগিয়ে যাবে।

নাসিমন ভবনে যুবদলের শোডাউন: ‘বিলুপ্ত’ কমিটি ফিরতেই চট্টগ্রামে নতুন প্রাণ

৩৬ জুলাই: একটি অবিনাশী প্রতীক ও নতুন বাংলাদেশের মহাকাব্য

আপডেট সময় : ০৪:৪৬:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

রাসেল চৌধুরী :

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টালে ৩১ জুলাইয়ের পর স্বাভাবিক নিয়মেই আসে ১ আগস্ট। কিন্তু ২০২৪ সালের বাংলাদেশে ইতিহাসের নিজস্ব এক ক্যালেন্ডার তৈরি হয়েছিল, যেখানে আগস্টের ৫ তারিখটিকে ছাত্র-জনতা চিনেছে ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে। ৩৬ জুলাই কোনো সাধারণ তারিখ নয়, এটি একটি রূপক, একটি অবিনাশী স্মারক এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরাচারী শাসনের পতনের প্রতীক।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন একপর্যায়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, তখন ছাত্র-জনতা প্রতিজ্ঞা করেছিল—যতক্ষণ না পর্যন্ত এই দেশের মানুষের মুক্তি আসবে, ততক্ষণ জুলাই মাস শেষ হবে না।

এই ‘জুলাই শেষ না হওয়ার’ প্রতীকী স্পৃহাই ৫ আগস্টকে ইতিহাসে ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে অমর করে তুলেছে।আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও উত্তাল জুলাই২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট কর্তৃক ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কোটা সংস্কার আন্দোলন পুনরায় মাথাচারা দিয়ে ওঠে।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা বৈষম্যহীন একটি মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের দাবিতে শান্তিপূর্ণ উপায়ে রাজপথে নেমে আসে। কিন্তু তৎকালীন অনির্বাচিত ও স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকার শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক দাবিকে চরম অবজ্ঞা করে। আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে কটূক্তি করা হয়, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আত্মসম্মানে চরম আঘাত হানে।

১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ যখন বুক চিতিয়ে পুলিশের বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে শহীদ হন, তখন পুরো দেশের মানুষের ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়।

আবু সাঈদের সেই বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ এবং পরবর্তীতে মীর মুগ্ধের ‘পানি লাগবে, কারো পানি লাগবে?’ বলতে বলতে চিরবিদায় নেওয়ার ঘটনা কোটি কোটি মানুষকে ঘরের বাইরে টেনে আনে। পুলিশ, র‍্যাব এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনগুলোর নির্মম বুলেটের আঘাতে প্রায় দেড় হাজার ছাত্র-জনতা শহীদ হন এবং হাজার হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেন। মৃত্যুর এই দীর্ঘ মিছিল দেখে কোটা সংস্কারের আন্দোলন এক দফায়—অর্থাৎ স্বৈরাচারের পদত্যাগের আন্দোলনে পরিণত হয়।‘৩৬ জুলাই’ ধারণার জন্ম ও এর সামাজিক-সাংস্কৃতিক অর্থরাষ্ট্রীয় বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের ব্যাপক দমন-পীড়ন, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, সান্ধ্য আইন (কারফিউ) এবং গণগ্রেপ্তারের মুখেও আন্দোলনকারীরা পিছু হঠেনি। আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সাধারণ নাগরিকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দেন—বিজয় না আসা পর্যন্ত জুলাই মাস শেষ হতে দেওয়া হবে না। তারা ক্যালেন্ডারের আগস্ট মাসের দিনগুলোকে জুলাইয়ের বর্ধিত অংশ হিসেবে গণনা করা শুরু করেন।

১ আগস্ট হয়ে ওঠে ৩২ জুলাই, ২ আগস্ট ৩৩ জুলাই—এভাবে ক্রমান্বয়ে ৫ আগস্ট রূপ নেয় ‘৩৬ জুলাই’-এ।

সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, ৩৬ জুলাই হলো এক চমৎকার ‘নাগরিক কল্পনা’ (Civic Imagination)। এটি এমন এক যৌথ রাজনৈতিক স্মৃতি, যেখানে একটি দেশের নাগরিকেরা স্বৈরাচারের চাপিয়ে দেওয়া ভয়ের সংস্কৃতিকে ভাঙার জন্য সময় ও ক্যালেন্ডারকে নিজেদের মতো করে পুনর্নির্মাণ করে নেন।

অধ্যাপক ও গবেষকদের মতে, ৩৬ জুলাইয়ের মাধ্যমে দেশের মানুষের মন থেকে দীর্ঘ দুই দশকের ভয়ের শাসন এক নিমেষেই উবে গিয়েছিল। এটি হয়ে উঠেছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ জয়ের হাতিয়ার।

৫ আগস্ট তথা ৩৬ জুলাইয়ের চূড়ান্ত মহাবিজয়২০২৪ সালের ৫ আগস্ট (৩৬ জুলাই) আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ বা ঢাকা অভিমুখে যাত্রার ডাক দেওয়া হয়। দেশের আনাচ-কানাচ থেকে লাখ লাখ মানুষ সব ধরনের ভয়-ভীতি, কারফিউ ও বুলেটের তোয়াক্কা না করে রাজধানী ঢাকার দিকে ধেয়ে আসে।

ছাত্র-জনতার এই বাঁধভাঙা জোয়ার দেখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুপুর নাগাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান।শেখ হাসিনার পতনের সাথে সাথে দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এক স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসান ঘটে। ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে লাখ লাখ মানুষের ঢল। অচেনা মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আনন্দের কান্না কান্দে, মিষ্টি বিতরণ করা হয় এবং রাজপথে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ছাত্ররা নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়।

ঢাকার দেয়ালগুলো রাতারাতি রূপ নেয় এক রঙিন ক্যানভাসে, যেখানে গ্রাফিতির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয় সাম্য, স্বাধীনতা এবং বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন।৩৬ জুলাইয়ের তাৎপর্য ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ৩৬ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় স্বাধীনতা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এটি শুধু একটি সরকারের পরিবর্তন নয়, বরং এটি ছিল পুরো রাষ্ট্রকাঠামোর দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক গণজাগরণ। তবে স্বৈরাচারের পতনের পরই একটি টেকসই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করা সহজ কাজ নয়। দীর্ঘ বছরের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে দেশের বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভীষণভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

৩৬ জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হলে আমাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে:১. প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার: দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিচার বিভাগ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করা।

২. মানবাধিকার ও জবাবদিহিতা: জুলাই অভ্যুত্থানে যারা সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে, তাদের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচারের আওতায় আনা।

৩. বৈষম্যহীন সমাজ গঠন: মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুসহ প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার রক্ষা করা।

৪. ভয়ের সংস্কৃতির চিরতরে অবসান: ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি এবং টর্চার সেলের মতো নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার স্থায়ী অবসান ঘটানো।উপসংহার৩৬ জুলাই কোনো সাধারণ দিন নয়; এটি আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, ওয়াসিম, প্রিয়াদের মতো শত শত শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এক নতুন ভোরের নাম। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, দেশের সাধারণ ছাত্র-জনতা যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন কোনো বুলেট বা স্বৈরাচারী শক্তি তাদের দাবিয়ে রাখতে পারে না।

৩৬ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিনাশী স্মারক হিসেবে টিকে থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চিরন্তন প্রেরণা জুগিয়ে যাবে।