ককটেল সদৃশ বস্তুর বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দে আতঙ্ক, পুলিশি অভিযানে আটক ১১, এলাকায় অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন
নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানাধীন এক্সেস রোড সংলগ্ন সৈয়দশাহ রোড এলাকায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুটি স্থানীয় পক্ষের মধ্যে গভীর রাতে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
গতকাল রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টার দিকে শুরু হওয়া এই সংঘাতের জেরে পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষ চলাকালে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ও ককটেল সদৃশ বস্তুর বিকট শব্দ শোনা গেছে বলে দাবি করেছেন আতঙ্কিত স্থানীয় বাসিন্দারা।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং অভিযান চালিয়ে ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুই পক্ষের ১১ জনকে আটক করে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও নতুন করে উত্তেজনা এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বাকলিয়া সংলগ্ন এই এলাকাটিতে দীর্ঘদিন ধরেই ভাসমান মাদক কেনাবেচা এবং অলিগলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কিশোর গ্যাং ও বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনিক পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে অপরাধজগতের এই নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে স্থানীয় দুটি পক্ষ। অভিযোগ রয়েছে, তথাকথিত ‘মুরাদ গ্রুপ’ এবং ‘জসিম গ্রুপ’ নামের দুটি পক্ষের অনুসারীরা এই এলাকার খুচরা মাদকের স্পট ও ফুটপাতের অস্থায়ী দোকানপাট থেকে চাঁদাবাজির একক নিয়ন্ত্রণ নিতে লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সৈয়দশাহ রোডের এক স্থায়ী বাসিন্দা বলেন, “রাত ১১টার দিকে হঠাৎ বিকট চিৎকার ও গালিগালাজের শব্দে আমরা ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে দিই। দুই পক্ষই একে অপরকে তাড়া করছিল এবং ইট পাটকেল ছুড়ছিল। এ সময় কয়েকটি বিকট শব্দ শোনা যাওয়ায় আমরা আতঙ্কে ঘরের আলো নিভিয়ে বসে থাকি।” অপর এক ব্যবসায়ী বলেন, “অলিগলিতে মাদক কেনাবেচা নিয়ে প্রায়ই এই ছেলেদের মধ্যে ঝামেলা হয়। মাঝেমধ্যে পুলিশ এসে ধরপাকড় করলেও কিছুদিন পর আবারও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমরা ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকরা সবসময় এক ধরনের আতঙ্কে থাকি।
সংঘর্ষের এই ঘটনায় কোনো কোনো মহলের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও স্থানীয় মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এলাকার দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতারা স্পষ্ট করে বলেছেন, “মাদক ব্যবসায়ী, কিশোর গ্যাং কিংবা চাঁদাবাজদের কোনো রাজনৈতিক দল হতে পারে না। দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ অপরাধ করলে তার দায় দল নেবে না।” স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যেন কোনো দলীয় বিবেচনা না করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হয়। অপরদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্থানীয় প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, কোনো ধরনের দখলদারিত্ব ও মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং শান্তি বিঘ্নিতকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন স্বাধীনভাবে কাজ করবে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক ভূমিকার বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) দক্ষিণ জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. হাবিবুর রহমান প্রামাণিক সংবাদমাধ্যমকে জানান, “মূলত অবৈধ মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে মুরাদ ও জসিম গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে এই পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।” গুলির শব্দের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “সেখানে কোনো সরাসরি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেনি। উৎসুক কিছু যুবক পটকা ফাটিয়েছে এবং টিনের ঘরের ওপর পাথর নিক্ষেপের কারণে দূর থেকে বিকট শব্দ শোনা গেছে।
বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনুর আলম জানান, পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আমরা এ পর্যন্ত ১১ জনকে আটক করেছি। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অপরাধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অপরাধী যেই হোক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং জড়িত বাকিদের ধরতেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।













