রাসেল চৌধুরী
রাতের কোলাহল যখন চট্টগ্রাম শহরের বাকি অংশকে একটু একটু করে ক্লান্তির চাদরে ঢাকতে শুরু করে, ঠিক তখনই অন্য এক জীবনস্পন্দন ডানা মেলে কোতোয়ালী থানার জামাল খান মোড়ে। চারপাশের নিয়ন আলোর খেলা, ফুটপাতের চায়ের দোকানে মাটির কাপের ঠুনঠুন শব্দ আর একদল মানুষের প্রাণবন্ত হাসির আওয়াজ জানান দেয়—এখানে আড্ডা শুধু সময় কাটানো নয়, এটি এক জীবন্ত নাগরিক উৎসব।
যান্ত্রিক জীবনের সব জটিল হিসাব-নিকাশ একপাশে সরিয়ে রেখে, এই চত্বরটি প্রতিদিন অলিখিতভাবে বুক পেতে দেয় হাজারো চাটগাঁইয়ার ক্লান্তি জুড়ানোর জন্য। এটি যেন বীর চট্টলার এক অনন্য সাংস্কৃতিক ফুসফুস, যেখানে ইট-পাথরের রাজত্বেও মানুষ বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে আসে।

দিনের বেলা যে জামাল খান ব্যস্ত কর্পোরেট পেশাজীবী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী আর যানবাহনের চাকা ঘোরার তীব্র কোলাহলে মুখর থাকে, সূর্য ডোবার পর তার রূপ বদলে যায় সম্পূর্ণ। চেরাগী পাহাড় আর চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এই মোহনায় আলো-আঁধারির মাঝে বসে সংস্কৃতির হাট। এখানকার আড্ডায় কোনো কৃত্রিমতা নেই, নেই কোনো যান্ত্রিক রোবোটিক ফর্মুলা। ফুটপাতে পাতা বেঞ্চে আলতো করে বসে ইটের দেয়ালে তাকালে যে কেউ খুঁজে পাবেন এ মাটির হাজার বছরের ইতিহাস আর ঐতিহ্য। একপাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু তরুণ গিটার হাতে চড়া সুরে গাইছে আইয়ুব বাচ্চু কিংবা এলআরবির সেই চেনা গান, আর তার ঠিক কয়েক হাত দূরেই হয়তো ষাটোর্ধ্ব একদল প্রবীণ প্রাতঃভ্রমণকারী মেতে আছেন তাদের পুরোনো দিনের সোনালী নস্টালজিয়ায়।
জামাল খানের আড্ডার অন্যতম বড় শক্তি হলো এর অন্তর্ভুক্তি ও বৈচিত্র্য। আধুনিক যুগের বড় বড় ক্যাফে বা রেস্তোরাঁ কালচারের ছোঁয়া এখানে লাগলেও, এখানকার আসল প্রাণ লুকিয়ে আছে রাস্তার ধারের ঐতিহ্যবাহী টং দোকানগুলোতে। মাটির কাপে ধোঁয়া ওঠা কড়া লিকারের চা, হাতে গরম গরম সমোসা কিংবা ডালপুরি, আর মুখে অন্তহীন তর্কের ঝড়—এটাই এখানকার আসল চাটগাঁই মেজাজ। এখানে কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অ্যালগরিদম মানুষের এই নিখাদ বাস্তব আবেগকে ফুটিয়ে তুলতে পারবে না। মানুষের সশব্দ হাসি, দীর্ঘশ্বাস আর চায়ের কাপের আলতো চুমুকেই প্রতিদিন নতুন করে বাঁচে এই চত্বর।
এখানে কেউ কারও অপরিচিত নয়। সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী থেকে শুরু করে দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ—সবাই যেন এই এক মোহনায় এসে একাত্ম হয়ে যান। বইয়ের দোকান ‘বাতিঘর’ থেকে প্রিয় লেখকের নতুন বইটি কিনে বের হওয়া এক নিবিষ্ট পাঠক যখন ফুটপাতের আলোয় বসে পৃষ্ঠার গন্ধ নেন, ঠিক তার পাশেই হয়তো স্থানীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে চলে তুমুল বিশ্লেষণ। এই যে এক ছাদের নিচে এত ভিন্নমতের সহাবস্থান, এটাই জামাল খানকে পুরো চট্টগ্রামের মধ্যে অনন্য করে তুলেছে।
রাত যত গভীর হয়, এখানকার কোলাহল যেন এক অদ্ভুত মায়াবী শান্তিতে রূপ নেয়। বন্ধুদের তীব্র খুনসুটি, প্রিয় মানুষের সাথে কাটানো মৃদু গুঞ্জনের মুহূর্ত কিংবা জীবনের কঠিন লড়াইয়ের গল্পগুলো মিলেমিশে এক হয়ে যায় এখানকার বাতাসে। ইট-পাথরের এই নিষ্ঠুর ও একাকী নগরে মানুষ যখন বড্ড একাকী বোধ করে, তখন জামাল খানের এই নৈশকালীন আড্ডাগুলো তাকে মনে করিয়ে দেয়—দিনশেষে আমরা সবাই মানুষ, আমাদের সবারই একটা ঘরের বাইরের আস্থার আশ্রয় চাই। এই আড্ডা কেবল সময় কাটানোর সস্তা মাধ্যম নয়, এটি আসলে চট্টগ্রামের বুকে পরম যত্নে বেঁচে থাকা এক টুকরো জীবন্ত সামাজিক দলিল ও নিখাদ ভালোবাসার চিরন্তন বাতিঘর।













