ঢাকা ০২:১১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুড়ঙ্গ রহস্য আর নগর ভবনের নাটকের পর ডান্ডাবেড়ি পরা সেই ‘বগা’ এখন শ্রীঘরে

  • আপডেট সময় : ০৩:২৬:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
  • 24

আদালতে নাটকীয় আত্মসমর্পণ; ওসির বিদায় ও মেয়রের ‘জুলাই যোদ্ধা’ সাফাইয়ের পর শেষ রক্ষা হলো না বিতর্কিত এই কিশোর গ্যাং লিডারের

নিজস্ব প্রতিবেদক 

পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল ঘরের গোপন সুড়ঙ্গের কাছে গিয়ে। এরপর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নগর ভবনে তাকে ঘিরে পুলিশের নাটকীয় অভিযানও ভেস্তে যায় ‘ওপরের’ হস্তক্ষেপে। অপরাধের জাল বিছিয়ে একের পর এক মামলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নাচানো সেই আলোচিত সন্ত্রাসী, কিশোর গ্যাং ও ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের নিয়ন্ত্রক ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা শেষ পর্যন্ত শ্রীঘরেই ঠাঁই পেলেন। দীর্ঘ আত্মগোপন ও তীব্র বিতর্কের পর আজ রোববার দুপুরে তিনি চট্টগ্রামের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এসে নাটকীয়ভাবে আত্মসমর্পণ করেন।
আদালত প্রাঙ্গণে সাধারণ মানুষের কৌতূহল ও ব্যাপক গুঞ্জনের মধ্যে বগার আইনজীবীরা জামিনের জোর আবেদন করলেও বিচারক মো. মহিদুল ইসলাম তা সরাসরি নামঞ্জুর করে তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) হাসান ইকবাল চৌধুরী আদালতের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মূলত চট্টগ্রাম খবরের সম্পাদক শেখ মুহাম্মদ আরিফের দায়ের করা সাম্প্রতিক একটি গুরুতর অপহরণ ও চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার এড়াতে না পেরে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন।
চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের এক রহস্যময় নাম এই ‘বিহারী বগা’। একসময় নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়কের পদ বাগিয়ে নিলেও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের অভিযোগে গত জুনেই তাকে দল থেকে ছুড়ে ফেলা হয়। কিন্তু তার অপরাধের সাম্রাজ্য তাতে থামেনি। হত্যা, অস্ত্র, মাদক, জমি দখল, পুলিশের ওপর হামলা ও বিস্ফোরকসহ অন্তত ২৩টি মামলার এই আসামির খুঁটির জোর নিয়ে গত কয়েকমাস ধরে বন্দরনগরীতে তোলপাড় চলছে।
বগাকে ধরার গল্পগুলো সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। গত ৪ সেপ্টেম্বর খুলশীর ওয়্যারলেস কলোনিতে তাকে ধরতে গিয়ে বগার অনুসারীদের ককটেল ও ইটপাটকেলের হামলার মুখে পড়ে পুলিশ। রক্তক্ষয়ী সেই হামলায় খুলশী থানার তৎকালীন ওসিসহ ৬ পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন, ভাঙচুর করা হয় পুলিশের গাড়ি। এরপর পুলিশ বগার ঘরে তল্লাশি চালিয়ে পায় একটি সুড়ঙ্গের সন্ধান, যা দিয়ে তিনি অনায়াসে পালিয়ে যান।
সবচেয়ে বড় নাটকটি মঞ্চস্থ হয় গত ৬ অক্টোবর রাতে। চসিকের টাইগার পাস নগর ভবনে বগা অবস্থান করছেন—এমন নিখুঁত খবরের ভিত্তিতে পুরো ভবন ঘিরে ফেলে পুলিশ। কিন্তু ভবনের ভেতরে ঢুকতে এবং বগাকে ধরতে তৎকালীন ওসির ওপর অদৃশ্য বাধা আসে। ঘটনার পরদিন নবনির্বাচিত চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন উল্টো ওসির বিরুদ্ধে ‘আওয়ামী লীগ প্রীতির’ অভিযোগ তুলে বগাকে ‘জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা’ বলে সাফাই গান। মেয়রের এমন প্রকাশ্য ক্ষোভের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সিএমপির ওই ক্ষমতাধর ওসি আব্দুর রহিমকে প্রথমে বদলি এবং পরদিন একপ্রকার শাস্তি হিসেবে চট্টগ্রাম থেকে একবারে খুলনা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ওসি বদলির এই ঘটনায় যখন পুরো পুলিশ প্রশাসনের মনোবল ভেঙে পড়ার উপক্রম, তখনই আজ নাটকীয়ভাবে আদালতের কাঠগড়ায় হাজির হন বগা। ২০১৮ সালের একটি পুরোনো অস্ত্র মামলায় পরোয়ানার বিপরীতে জামিন পেলেও, সাংবাদিককে অপহরণ ও চাঁদা দাবির মামলায় আদালত তাকে কোনো ছাড় দেয়নি।
নগর পুলিশের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বগা পার পাওয়ার যে চেষ্টা করছিলেন, তার বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের তীব্র ক্ষোভ এবং পুলিশের ওপর মহলের কঠোর অবস্থানের কারণেই শেষ পর্যন্ত তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছেন। সুড়ঙ্গ কাটা এই কিশোর গ্যাং লিডারের কারাগারে যাওয়ার খবরে খুলশী ও পাহাড়তলী এলাকার সাধারণ ব্যবসায়ীদের মাঝে স্বস্তি ফিরলেও, নগর ভবনের সেই রাতের ঘটনার পেছনে কারা ছিলেন—তা নিয়ে নগরজুড়ে এখনো চলছে নানামুখী আলোচনা।

৫০০ কোটি টাকার ঐতিহাসিক স্টার্টআপ তহবিল ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

সুড়ঙ্গ রহস্য আর নগর ভবনের নাটকের পর ডান্ডাবেড়ি পরা সেই ‘বগা’ এখন শ্রীঘরে

আপডেট সময় : ০৩:২৬:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

আদালতে নাটকীয় আত্মসমর্পণ; ওসির বিদায় ও মেয়রের ‘জুলাই যোদ্ধা’ সাফাইয়ের পর শেষ রক্ষা হলো না বিতর্কিত এই কিশোর গ্যাং লিডারের

নিজস্ব প্রতিবেদক 

পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল ঘরের গোপন সুড়ঙ্গের কাছে গিয়ে। এরপর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নগর ভবনে তাকে ঘিরে পুলিশের নাটকীয় অভিযানও ভেস্তে যায় ‘ওপরের’ হস্তক্ষেপে। অপরাধের জাল বিছিয়ে একের পর এক মামলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নাচানো সেই আলোচিত সন্ত্রাসী, কিশোর গ্যাং ও ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের নিয়ন্ত্রক ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা শেষ পর্যন্ত শ্রীঘরেই ঠাঁই পেলেন। দীর্ঘ আত্মগোপন ও তীব্র বিতর্কের পর আজ রোববার দুপুরে তিনি চট্টগ্রামের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এসে নাটকীয়ভাবে আত্মসমর্পণ করেন।
আদালত প্রাঙ্গণে সাধারণ মানুষের কৌতূহল ও ব্যাপক গুঞ্জনের মধ্যে বগার আইনজীবীরা জামিনের জোর আবেদন করলেও বিচারক মো. মহিদুল ইসলাম তা সরাসরি নামঞ্জুর করে তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) হাসান ইকবাল চৌধুরী আদালতের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মূলত চট্টগ্রাম খবরের সম্পাদক শেখ মুহাম্মদ আরিফের দায়ের করা সাম্প্রতিক একটি গুরুতর অপহরণ ও চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার এড়াতে না পেরে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন।
চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের এক রহস্যময় নাম এই ‘বিহারী বগা’। একসময় নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়কের পদ বাগিয়ে নিলেও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের অভিযোগে গত জুনেই তাকে দল থেকে ছুড়ে ফেলা হয়। কিন্তু তার অপরাধের সাম্রাজ্য তাতে থামেনি। হত্যা, অস্ত্র, মাদক, জমি দখল, পুলিশের ওপর হামলা ও বিস্ফোরকসহ অন্তত ২৩টি মামলার এই আসামির খুঁটির জোর নিয়ে গত কয়েকমাস ধরে বন্দরনগরীতে তোলপাড় চলছে।
বগাকে ধরার গল্পগুলো সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। গত ৪ সেপ্টেম্বর খুলশীর ওয়্যারলেস কলোনিতে তাকে ধরতে গিয়ে বগার অনুসারীদের ককটেল ও ইটপাটকেলের হামলার মুখে পড়ে পুলিশ। রক্তক্ষয়ী সেই হামলায় খুলশী থানার তৎকালীন ওসিসহ ৬ পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন, ভাঙচুর করা হয় পুলিশের গাড়ি। এরপর পুলিশ বগার ঘরে তল্লাশি চালিয়ে পায় একটি সুড়ঙ্গের সন্ধান, যা দিয়ে তিনি অনায়াসে পালিয়ে যান।
সবচেয়ে বড় নাটকটি মঞ্চস্থ হয় গত ৬ অক্টোবর রাতে। চসিকের টাইগার পাস নগর ভবনে বগা অবস্থান করছেন—এমন নিখুঁত খবরের ভিত্তিতে পুরো ভবন ঘিরে ফেলে পুলিশ। কিন্তু ভবনের ভেতরে ঢুকতে এবং বগাকে ধরতে তৎকালীন ওসির ওপর অদৃশ্য বাধা আসে। ঘটনার পরদিন নবনির্বাচিত চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন উল্টো ওসির বিরুদ্ধে ‘আওয়ামী লীগ প্রীতির’ অভিযোগ তুলে বগাকে ‘জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা’ বলে সাফাই গান। মেয়রের এমন প্রকাশ্য ক্ষোভের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সিএমপির ওই ক্ষমতাধর ওসি আব্দুর রহিমকে প্রথমে বদলি এবং পরদিন একপ্রকার শাস্তি হিসেবে চট্টগ্রাম থেকে একবারে খুলনা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ওসি বদলির এই ঘটনায় যখন পুরো পুলিশ প্রশাসনের মনোবল ভেঙে পড়ার উপক্রম, তখনই আজ নাটকীয়ভাবে আদালতের কাঠগড়ায় হাজির হন বগা। ২০১৮ সালের একটি পুরোনো অস্ত্র মামলায় পরোয়ানার বিপরীতে জামিন পেলেও, সাংবাদিককে অপহরণ ও চাঁদা দাবির মামলায় আদালত তাকে কোনো ছাড় দেয়নি।
নগর পুলিশের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বগা পার পাওয়ার যে চেষ্টা করছিলেন, তার বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের তীব্র ক্ষোভ এবং পুলিশের ওপর মহলের কঠোর অবস্থানের কারণেই শেষ পর্যন্ত তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছেন। সুড়ঙ্গ কাটা এই কিশোর গ্যাং লিডারের কারাগারে যাওয়ার খবরে খুলশী ও পাহাড়তলী এলাকার সাধারণ ব্যবসায়ীদের মাঝে স্বস্তি ফিরলেও, নগর ভবনের সেই রাতের ঘটনার পেছনে কারা ছিলেন—তা নিয়ে নগরজুড়ে এখনো চলছে নানামুখী আলোচনা।