আটলান্টিকের দুই পাড়ে তুমুল উত্তেজনা; মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন ও ইরান যুদ্ধের আগুনে ঘি; রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ঠেকাতে ইউরোপের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের বারুদের গন্ধ এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির তীব্র চাপ—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজার যখন খাদের কিনারায়, ঠিক তখনই এক অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন সমঝোতায় পৌঁছাল বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও শিল্পোন্নত সাত দেশের জোট জি-৭। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি আক্রমণাত্মক হুমকি ও তীব্র ‘ব্ল্যাকমেইল’-এর মুখে কার্যত নতি স্বীকার করে নিজেদের অতি সুরক্ষিত জরুরি কৌশলগত মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে এই শক্তিশালী জোট। [
গতকাল শুক্রবার (২ অক্টোবর) এক রুদ্ধদ্বার জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠকে জোটের শীর্ষ নেতারা এই ঐতিহাসিক ও বাঁচন-মরন নীতিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছান। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সরাসরি সমন্বয়ে এই বিশাল পরিমাণ জ্বালানি আগামী চার মাস ধরে বিশ্ববাজারে ধাপে ধাপে ঢালা হবে, যার মূল লক্ষ্য থাকবে লাগামহীনভাবে ছুটতে থাকা আকাশচুম্বী তেলের দাম টেনে ধরা।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তকে দেখছেন ইউরোপের ওপর ওয়াশিংটনের একচেটিয়া আধিপত্যের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে। মূলত, আগামী নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজেল ও জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। রয়টার্স ও ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৩২ শতাংশে এসে ঠেকেছে, যেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর ক্ষেত্রে তাঁর ওপর সন্তুষ্ট মাত্র ১৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক।
এই রাজনৈতিক বিপর্যয় ঠেকাতে ট্রাম্প প্রশাসন চরম আগ্রাসী পন্থা অবলম্বন করে। ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ইউরোপ যদি তাদের নিজেদের আপৎকালীন মজুত থেকে ডিজেল বাজারে না ছাড়ে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে মার্কিন ডিজেল রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে। শীতের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে মার্কিন ডিজেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ইউরোপ এই প্রচ্ছন্ন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকিতে কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ে। ফলে গতকালের বৈঠকে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলো (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও জাপান) কেবল তাদের জরুরি তেলের ভান্ডার খুলে দিতেই বাধ্য হয়নি, বরং নিজেদের মধ্যে জ্বালানি পণ্যের ওপর নতুন কোনো রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ারও মুচলেকা দিয়েছে।
সিদ্ধান্ত আসার পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একে স্বাগত জানিয়ে প্রক্রিয়াটি ‘অবিলম্বে’ শুরু করার ঘোষণা দেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ১০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি পুরোপুরি একটি ভূরাজনৈতিক পাশাখেলা। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের চলমান সরাসরি সংঘাতের জেরে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এর মধ্যেই বৈশ্বিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করে চীন তাদের নিজস্ব মজুত সুরক্ষায় পুরো অক্টোবর মাস জুড়ে সব ধরনের জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ডিজেল উৎপাদনকারী বড় বড় শোধনাগার বা রিফাইনারিগুলোর মেরামত কাজ যাতে একসাথে না পড়ে এবং সরবরাহ ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও জি-৭ নেতারা একযোগে কাজ করার চুক্তি করেছেন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সরবরাহ কার্যক্রম আগামী চার মাস ধরে চললেও এর বড় অংশই থাকবে ‘ফ্রন্টলোডেড’ অর্থাৎ শুরুর দিকেই বেশি ছাড় করা হবে। বিশেষ করে আগামী ২০ দিনের মধ্যে বাজারে একটি বিশাল পরিমাণ ডিজেল নিয়ে আসা হবে। কারণ শীতকাল ঘনিয়ে আসায় পশ্চিমা দেশগুলোতে ঘর গরম রাখার হিটিং অয়েল এবং ভারী পরিবহন খাতের জন্য ডিজেলের সংকট এখন তীব্রতম রূপ ধারণ করেছে।
জি-৭-এর এই আকস্মিক ও বড় ধাক্কার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আজ সকাল থেকেই কিছুটা নিম্নমুখী হতে শুরু করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্বস্তি খুবই সাময়িক। যতক্ষণ না মধ্যপ্রাচ্যের বারুদের আগুন নিভছে এবং ইরানের সাথে সংঘাতের স্থায়ী সমাধান হচ্ছে, ততক্ষণ তেলের এই কৃত্রিম সরবরাহ দিয়ে বাজারকে দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব হবে না; কারণ এটি কোনো নতুন উৎপাদন নয়, বরং ঘরের জমানো তেল এনে বাজারে ঢালা।
এদিকে, বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই সিদ্ধান্ত আপাতকালীনের জন্য স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলে দেশের ক্রমাগত কমতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কিছুটা কমবে এবং ডলার সাশ্রয় হবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপ যদি আরও বাড়ে, তবে এই সাময়িক সুফল ভেস্তে যেতে সময় লাগবে না বলে মনে করছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা।













