দুর্যোগ সামলে চট্টগ্রামের চমক, মাদ্রাসা-কারিগরি বোর্ডে নজিরবিহীন ধস; সাফল্যের শীর্ষে রাজধানীর রাজউক, নটর ডেম ও চট্টগ্রামের সরকারি কলেজগুলো; অকৃতকার্যদের জন্য এক মাসের মধ্যে বিশেষ পরীক্ষা
নিজস্ব প্রতিবেদক
উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষা ২০২৬-এর ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত বছরের (৫৮.৮৩%) চেয়ে ৬.৭১ শতাংশ কম। মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডসহ দেশজুড়ে মোট জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী। সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫১.৬২ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন। ফলাফলে পাসের হারের দিক থেকে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। মেয়েদের পাসের হার ৫৪.৩৮ শতাংশ, যেখানে ছেলেদের পাসের হার ৪৯.৭২ শতাংশ। তবে জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে এগিয়ে রয়েছে ছেলেরা।
আজ শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ১১টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা করেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
এবারের পাসের হার ও জিপিএ-৫ এর সংখ্যা সামগ্রিকভাবে কমলেও বরাবরের মতোই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় নামী কলেজগুলো। পাসের হার ও রেকর্ড জিপিএ-৫ নিয়ে শীর্ষ ৫-এ রয়েছে রাজউক উত্তরা মডেল কলে। প্রতি বছরের মতো এবারও শতভাগ পাসের গৌরব ধরে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা মিলিয়ে এই কলেজ থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাওয়ার রেকর্ড গড়েছেন। নটর ডেম কলেজ (ঢাকা): এই প্রতিষ্ঠান থেকে বিজ্ঞান বিভাগসহ সব বিভাগ মিলিয়ে পাসের হার শতভাগ। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যায় ঢাকার মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থান অধিকার করেছে কলেজটি। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও চট্টগ্রাম বোর্ডে শীর্ষস্থান দখল করেছে এইট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম কলেজ। শতভাগ পাসের পাশাপাশি এই কলেজের সিংহভাগ শিক্ষার্থীই জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
এদিকে চট্টগ্রাম বোর্ডের ফল বিপর্যয় রুখে দিতে মহসিন কলেজের পরীক্ষার্থীরা দারুণ অবদান রেখেছে। জিপিএ-৫ ও পাসের হারে এটি বোর্ডের শীর্ষ তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ (ঢাকা)সুশৃঙ্খল পাঠদান ও কঠোর তদারকির কারণে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এবারও শতভাগ পাসসহ বিপুল সংখ্যক জিপিএ-৫ পেয়ে দেশসেরা পাঁচের তালিকায় নিজেদের অবস্থান পোক্ত করেছে।
চলতি বছর জুলাই মাসে ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টেনে নিয়ে পরীক্ষা শেষ করা হয়। সহপাঠীদের চেয়ে দেরিতে পরীক্ষা শেষ করার মানসিক চাপ সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বোর্ড পাসের হারে চমক দেখিয়েছে। এই বোর্ডে পাসের হার ৫২.০৭ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সরকারি ও বেসরকারি ৪টি কলেজ স্থান করে নিয়েছে। মাত্র ৫১ দিনের মাথায় এই নিখুঁত ফলাফল প্রকাশকে বোর্ডের বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এবারের ফলাফলে বোর্ডভিত্তিক পাসের হার ও জিপিএ-৫ এর সংখ্যায় বড় ধরনের তারতম্য দেখা গেছে। ঢাকা বোর্ড: পাসের হার ৫৩.১০% (জিপিএ-৫: ১১,৪৫০ জন। চট্টগ্রাম বোর্ড: পাসের হার ৫২.০৭% (জিপিএ-৫: ২,৯২৯ জনসিলেট বোর্ড: পাসের হার ৫০.৯০% (জিপিএ-৫: ১,২০৪ জন। কুমিল্লা বোর্ড: পাসের হার ৪৮.0৪% (জিপিএ-৫: ১,৩১৩ জন। দিনাজপুর বোর্ড: পাসের হার ৪৫.৯৮% (জিপিএ-৫: ২,৯৭৩ জন। রাজশাহী বোর্ড: পাসের হার ৪৫.০৬% (জিপিএ-৫: ৪,৫২০ জন। যশোর বোর্ড: পাসের হার ৪৪.৯২% (জিপিএ-৫: ৩,২২৮ জন। বরিশাল বোর্ড: পাসের হার ৪৪.৮৪% (জিপিএ-৫: ৫,৯৫০ জন্য ও ময়মনসিংহ বোর্ড: পাসের হার ৪৩.৮০% (জিপিএ-৫: ২,৩৮৪ জন)।
সাধারণ বোর্ডগুলোর তুলনায় মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এবার বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। পাসের হার এক ধাক্কায় ১৪.৫৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৬১.০৭ শতাংশে (গত বছর ছিল ৭৫.৬১%)। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩,২৫০ জন।
কারিগরি বোর্ডে এবার পাসের হার নেমে এসেছে মাত্র ৪৯.৪৩ শতাংশে, অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। এই বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ৮৮৬ জন। শিক্ষাবিদেরা বলছেন, প্রশ্নপদ্ধতির হঠাৎ পরিবর্তন এবং ব্যবহারিক ও খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকদের একাংশের গাফিলতির কারণেই কারিগরিতে এই বিপর্যয়।
ফলাফল প্রকাশের পর সারাদেশে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের মতে, সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতির নতুন খাতা মূল্যায়ন নির্দেশিকা এবং কিছু বোর্ডে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়াতেই পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমেছে। তবে এটিকে ‘বাস্তবধর্মী মূল্যায়ন’ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
ঢাকা ও কুমিল্লা বোর্ডের বেশ কিছু কেন্দ্রের অভিভাবকরা ফলাফল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ের কঠিন প্রশ্ন এবং কঠোর খাতা দেখার কারণে অনেক ভালো শিক্ষার্থীও কাঙ্ক্ষিত জিপিএ-৫ পায়নি।
দুর্যোগের ধকল কাটিয়ে ভালো ফল করায় চট্টগ্রামের কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষার্থীদের আনন্দ-উল্লাস করতে দেখা যায়। এক পরীক্ষার্থী জানান, “দেরিতে পরীক্ষা হওয়ায় আমরা মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু শিক্ষকেরা আমাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন।”
ফলাফল বিপর্যয় ও শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বিবেচনা করে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন একটি যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানান, যেসব পরীক্ষার্থী এবার এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য (ফেল) হয়েছে, তাদের শিক্ষাবর্ষ বাঁচাতে আগামী এক মাসের মধ্যে বিশেষ পুনঃপরীক্ষা (সাপ্লিমেন্টারি এক্সাম) নেওয়া হবে।
ফলাফলে অসন্তুষ্ট শিক্ষার্থীরা আগামীকাল ১ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের (বোর্ড চ্যালেঞ্জ) আবেদন করতে পারবেন। শুধুমাত্র টেলিটক প্রিপেইড মোবাইল ফোন থেকে এসএমএস (SMS) এর মাধ্যমে আবেদন করা যাবে। মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে RSC <স্পেস> বোর্ডের নামের প্রথম ৩ অক্ষর <স্পেস> রোল নম্বর <স্পেস> বিষয় কোড লিখে পাঠিয়ে দিতে হবে 16222 নম্বরে।
শিক্ষার্থীরা সমন্বিত ওয়েবসাইট Educational Board Results থেকে মার্কশিটসহ ফল ডাউনলোড করতে পারছেন। এছাড়া মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে ফল জানতে HSC <স্পেস> বোর্ডের নামের প্রথম ৩ অক্ষর <স্পেস> রোল নম্বর <স্পেস> 2026 লিখে পাঠিয়ে দিতে হবে ১৬১৪০ নম্বরে।













