বিশেষ প্রতিবেদক
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের এক যুগেরও বেশি সময় পার হলেও বিচার পাওয়ার পথ এখনো সম্পূর্ণ অন্ধকারে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আদালতে পুনরায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আগামী ৫ নভেম্বর নতুন তারিখ ধার্য করেছেন। এর মাধ্যমে দেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার সময়সীমা রেকর্ড ১৩০ বারের মতো পেছাল।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি ।
ঘটনার পরদিন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। এক এক করে থানা পুলিশ, ডিবি এবং দীর্ঘ ১২ বছর র্যাবের তদন্ত ব্যর্থতার পর হাইকোর্টের নির্দেশনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্সের তত্ত্বাবধানে বর্তমানে পিবিআই এর তদন্ত চালাচ্ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রধান প্রসিকিউটর এই হত্যাকাণ্ডে বিগত আমলের একজন প্রভাবশালী ‘সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের’ জড়িত থাকার প্রাথমিক ক্লু পাওয়ার কথা জানালে মামলাটি নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে এখনো পর্যন্ত মূল রহস্য ফাইলচাপাই রয়ে গেছে।
দীর্ঘ ১৪ বছরের এই অন্তহীন অপেক্ষা ও বিচারহীনতায় সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত সাগর-রুনির পরিবার। মামলার বাদী ও মেহেরুন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান ক্ষোভ প্রকাশ করে এই প্রতিবেদককে বলেন, ১৩০ বার তারিখ পেছানো কোনো সাধারণ আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি আমাদের ক্ষতবিক্ষত পরিবারের সাথে দীর্ঘ এক যুগ ধরে চলা রাষ্ট্রীয় তামাশা। সংস্থা বদল হয়, তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়, বড় বড় আশ্বাস আসে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। আমরা এখন মানসিকভাবে ক্লান্ত। আমরা শুধু জানতে চাই, আমাদের ভাই-বোনকে কারা মারল আর কেন মারল। এ কারণে আমরা সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও (আইসিটি) সুষ্ঠু তদন্তের জন্য আবেদন জানিয়েছি।
হত্যাকাণ্ডের সময় মাত্র সাড়ে চার বছর বয়সে মা-বাবাকে হারানো তাদের একমাত্র সন্তান মাহির সারোয়ার মেঘের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে শুধুই এই বিচারের অপেক্ষায়। পরিবারের এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় জানান, মেঘ এখন প্রাপ্তবয়স্ক, তবে প্রতিবার যখন আদালতে তারিখ পেছানোর খবর আসে, সে স্তব্ধ হয়ে যায়। রাষ্ট্রের কাছে তার নীরব প্রশ্ন—”আমার মা-বাবার খুনিরা কি চিরকালই অধরা থেকে যাবে?”
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত ও বিচারহীনতার প্রতীক। দিনের পর দিন বিচারের এই দীর্ঘসূত্রতাকে সাংবাদিক সমাজ স্বাধীন সাংবাদিকতার টুঁটি চেপে ধরার শামিল বলে মনে করছে।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) এবং বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মীরা বলেন, যে দেশে দুজন নামকরা জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নিজ ঘরে নির্মমভাবে খুন হন এবং এক যুগেও তার চার্জশিট দেওয়া যায় না, সেখানে মাঠপর্যায়ের সাধারণ সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই। ১৩০ বার তারিখ পেছানো বাংলাদেশের তদন্ত ব্যবস্থার জন্য একটি আন্তর্জাতিক লজ্জা। কোনো অদৃশ্য শক্তির কারণে এই মামলার তদন্ত ফাইল বছরের পর বছর আটকে আছে, তা আজ সাধারণ মানুষও বোঝে।
প্রবীণ সাংবাদিকরা মনে করিয়ে দেন যে, এর আগে বিগত সরকারের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৫ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিয়েছিলেন, আর সাবেক এক আইনমন্ত্রী বলেছিলেন তদন্ত শেষ হতে ৫০ বছরও লাগতে পারে। এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনৈতিক বক্তব্য শুরু থেকেই পুরো বিচার প্রক্রিয়াকে উপহাসে পরিণত করেছে।
আদালতে ১৩০ বার তারিখ পেছানোর খবর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ নাগরিক মহলেও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষ এখন চরম সন্দিহান ও হতাশ।
সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের এক সদস্য বলেন, “সাগর-রুনি হত্যা মামলা এখন আর কোনো সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়, এটি আমাদের দেশের আইনের শাসন ও বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতার একটি বড় পরীক্ষা। যদি প্রভাবশালী কেউ এর পেছনে না থাকে, তবে একটি ডাবল মার্ডারের ক্লু বের করতে ১৪ বছর লাগার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। রাষ্ট্র যদি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে চায়, তবে অনতিবিলম্বে আগামী ৫ নভেম্বরের মধ্যে একটি স্বচ্ছ ও চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।
মামলায় সাগর-রুনির পরিবারের নবনিযুক্ত আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, “আমরা নতুন করে এই মামলার রহস্য উন্মোচনে কাজ শুরু করেছি। নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত—সব জায়গাতেই আমরা জোরালো আইনি লড়াই চালিয়ে যাব। আমরা চাই তদন্ত সংস্থা কোনো অনুমানকে আগেভাগে সত্য ধরে না নিয়ে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও নিবিড় অনুসন্ধান চালাক।”
এদিকে পিবিআই ও সংশ্লিষ্ট টাস্কফোর্সের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, মামলার জট খুলতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলামত ও প্রাথমিক সাক্ষ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও তারা আগামী ৫ নভেম্বরের ডেডলাইনের মধ্যে অগ্রগতি প্রদর্শনের ব্যাপারে আশাবাদী।
এখন পুরো দেশের চোখ আগামী ৫ নভেম্বর ২০২৬ তারিখের দিকে। সেদিন কি সত্যিই পিবিআই ও টাস্কফোর্স আদালতে পূর্ণাঙ্গ কোনো চার্জশিট বা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে, নাকি এটি ১৩১ তম বারের মতো আরেকটি আনুষ্ঠানিক মুলতুবিতে পরিণত হবে—তা সময়ই বলে দেবে। তবে দেশের আপামর জনগণ ও সাংবাদিক সমাজ এবার আর কোনো অস্পষ্ট আশ্বাস বা কালক্ষেপণ নয়, অনতিবিলম্বে খুনিদের চিহ্নিতকরণ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চায়।













