রাসেল চৌধুরী
বাণিজ্যিক খাতের তীব্র ক্ষোভ ও নজিরবিহীন প্রতিবাদের মুখে অবশেষে নিজেদের একক ব্যাংকিং পেমেন্ট চালুর সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) । একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি ব্যাংকের (ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি) মাধ্যমে বন্দরের যাবতীয় চার্জ ও বিল পরিশোধ বাধ্যতামূলক করে গতকাল সকালে জারি করা একটি পরিপত্র মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মাথায় প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। আকস্মিক ও ‘অপরিকল্পিত’ এই সিদ্ধান্তের কারণে গতকাল সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের পণ্য খালাস ও সরবরাহ প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে, যাতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা। পরে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর আলটিমেটাম ও ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারে উত্তেজনার মুখে বিকেলে পূর্বের মাল্টি-ব্যাংক (একাধিক ব্যাংক) ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
হঠাৎ নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে ‘বাণিজ্যবিরোধী’ ও ‘স্বৈরাচারী’ আখ্যা দিয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম বিলু তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, দেশের আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের ব্যবসা ও অ্যাকাউন্ট ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন ব্যাংকে। রাতারাতি সবাইকে একটি নির্দিষ্ট ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে লেনদেন করতে বাধ্য করা কোনো বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হতে পারে না। এতে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র বিভ্রান্তি ও ভীতি তৈরি হয়েছিল। আগে যেখানে সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক ও এনআরবি ব্যাংকের মতো একাধিক মাধ্যমে টাকা জমা দেওয়া যেত, সেখানে একটি মাত্র ব্যাংকের কাউন্টারে পুরো দেশের বাণিজ্যকে জিম্মি করার এই চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ এবং অন্যান্য ব্যবসায়ী ফোরামের প্রতিনিধিরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এমনিতে বৈশ্বিক মন্দা ও ডলার সংকটে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে, তার ওপর বন্দর কর্তৃপক্ষের এমন সমন্বয়হীন সিদ্ধান্তের কারণে এক দিন পণ্য আটকে থাকলে ব্যবসায়ীদের লাখ লাখ টাকার ডেমারেজ (বিলম্ব মাশুল) ও শিপিং লাইনের জরিমানা গুনতে হতো। বাণিজ্যের এই স্পর্শকাতর সময়ে এমন হঠকারিতা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল সকাল ৮টায় নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর থেকেই বন্দরের ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। সিংহভাগ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের ইস্টার্ন ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট না থাকায় তারা বিল জমা দিতে পারেননি। ব্যাংকের কাউন্টারগুলোতে উপচে পড়া ভিড় তৈরি হয় এবং পেমেন্ট গেটওয়েতে জটিলতা দেখা দেয়। পণ্য খালাস করতে না পেরে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা বন্দর ভবনে গিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বিকেল হতেই বন্দর কর্তৃপক্ষ আগের নিয়মে লেনদেনের সুবিধা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরকে শতভাগ “কাগজবিহীন ও স্মার্ট বন্দর” হিসেবে গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে ১০০% অনলাইন বিলিং এবং টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম চালু করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই আধুনিকায়নের সুফল পাওয়ার চেয়ে তাদের ভোগান্তিই বেশি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্ট কর্মচারীদের শীর্ষ নেতারা অভিযোগ তুলে বলেন, বর্তমানে বন্দরে যে টিওএস ব্যবস্থা চালু আছে, তা প্রায়শই সার্ভার ডাউন বা কারিগরি ত্রুটির কারণে অচল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক সরঞ্জাম থাকলেও তা দক্ষ জনবলের অভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না, যা পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করছে।
ব্যবসায়ীরা স্পষ্ট জানান, তারা অটোমেশন ও স্মার্ট ব্যবস্থার পক্ষে, তবে পেমেন্টের ক্ষেত্রে কোনো একক ব্যাংকের মনোপলি বা একচেটিয়া রাজত্ব তারা মেনে নেবেন না। বাণিজ্যের স্বার্থে পেমেন্ট গেটওয়েতে দেশের সকল তফসিলি ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা উন্মুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।













