ঢাকা ০১:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাগজহীন হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর, ডিসেম্বরের মধ্যে স্মার্ট পোর্ট গড়ার মিশন

  • আপডেট সময় : ০৭:০০:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 36

শতভাগ ডিজিটালাইজেশনের পথে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক লাইফলাইন; দীর্ঘদিনের সনাতন ফাইল-সংস্কৃতি বাতিলের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও মাঠপর্যায়ে কারিগরি অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে রয়েছে বাস্তব শঙ্কা

রাসেল চৌধুরী

টেবিল থেকে টেবিলে নথির দৌড়াদৌড়ি, কাগজপত্রের পাহাড়, পণ্য খালাসের জন্য সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের দীর্ঘ অপেক্ষা আর ট্রাক-লরির চিরচেনা জটলা—দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের এই চেনা दृश्यপট এবার আমূল বদলে যাচ্ছে। আগামী ডিসেম্বর ২০২৬ সালের মধ্যে পুরো বন্দরকে শতভাগ ‘পেপারলেস’ বা কাগজহীন আধুনিক ‘স্মার্ট পোর্ট’-এ রূপান্তরের চূড়ান্ত লক্ষ্য বেঁধে দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ)। নতুন এই সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার ফলে আমদানি-রপ্তানির বিল পরিশোধ থেকে শুরু করে কনটেইনারের গেট পাস—সব ধরনের দাপ্তরিক ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পুরোপুরি চলে আসছে স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল নেটওয়ার্কে।

 

দীর্ঘদিনের সনাতন ও আমলাতান্ত্রিক ফাইল-সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার এই বিশাল রূপান্তরকে দেশের ব্যবসায়ী মহল স্বাগত জানালেও, মাঠপর্যায়ের কারিগরি অবকাঠামো, সার্ভার ব্যাকআপ এবং ব্যবহারকারীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিয়ে অংশীজনদের মধ্যে কিছু বাস্তব সংশয় ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

 

বন্দর ভবন সূত্রে জানা গেছে, বন্দরে আসা বিদেশি জাহাজের ভেসেল বিল ইতোমধ্যে শতভাগ অনলাইনে নেওয়া শুরু হয়েছে। এখন কনটেইনার ও আমদানিকারকদের কনসাইনি বিলও সরাসরি ‘টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম এর আওতায় এনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিশোধের ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হচ্ছে।

 

এই ডিজিটাল মিশনের সবচেয়ে বড় মাইলফলক হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আওতাধীন কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের সাথে বন্দরের টিওএস অ্যাপের সরাসরি রিয়েল-টাইম সংযোগ। এর ফলে কোনো চালানে জালিয়াতি বা শুল্কসংক্রান্ত জটিলতা থাকলে কাস্টমস তাদের সিস্টেমে কনটেইনার লক বা হোল্ড করার সাথে সাথেই বন্দরেও ফাইলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত হয়ে যাবে। এতে আগের মতো কাস্টমস ও বন্দরের মধ্যে ম্যানুয়াল নথিপত্র চালাচালির পেছনে দিনের পর দিন সময় অপচয় হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না।

 

প্রতিদিন বন্দরে পণ্য খালাস ও নিতে এসে হাজার হাজার ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানকে গেট পাসের ম্যানুয়াল যাচাইয়ের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। নতুন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় শতভাগ ই-গেট পাস, গেট ইন-আউট ট্র্যাকিং, অনলাইন কার্ট টিকিট এবং সুনির্দিষ্ট সময় ধরে গাড়ি প্রবেশের ‘টাইম স্লট ম্যানেজমেন্ট’ জোরদার করা হচ্ছে। ফলে বন্দর এলাকার চিরচেনা ট্রাফিক জটলা ও অযাচিত বিলম্ব অনেকাংশে কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্মেলনকক্ষে চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় কর্মকর্তাদের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে কোনো ডেস্কে বা ফাইলে যেন অযথা ম্যানুয়াল পদ্ধতি ধরে রাখা না হয়। তাছাড়া ‘পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের ব্যবস্থা করায় ব্যবসায়ীরা যেকোনো স্থান থেকে তাদের নথির লাইভ আপডেট আছে, তা সহজেই ট্র্যাক করতে পারছেন।

 

কাগজে-কলমে এই সর্বাধুনিক প্রযুক্তিকে স্বাগত জানালেও মাঠপর্যায়ে এর সফল বাস্তবায়ন নিয়ে খাত সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ তাড়া করে বেড়াচ্ছে। চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় বন্দরের টিওএস কিংবা কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা সার্ভার ডাউন থাকে বা কারিগরি ধীরগতি দেখা দেয়। সিস্টেম আধুনিক হলেও যদি নিরবচ্ছিন্ন ব্যাকআপ ও দক্ষ জনবল দ্রুত নিশ্চিত করা না যায়, তবে সার্ভার জটের কারণে পণ্য খালাসে উল্টো সময় বেশি লেগে যেতে পারে।

 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, অতীতে ব্যাংকিং চ্যানেলে অনলাইন পেমেন্ট বা কনটেইনার ছাড়ের কিছু নিয়মে কড়াকড়ি আরোপের কারণে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, কারিগরি ত্রুটির কারণে যেন তার পুনরাবৃত্তি না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

 

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক এক পরিচালক বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর যদি সত্যি আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণ পেপারলেস হতে পারে, তবে তা দেশের আমদানি-রপ্তানির ‘লিড টাইম’ (পণ্য পৌঁছানোর সময়) ও ব্যবসার খরচ একধাক্কায় অনেক কমিয়ে দেবে। তবে শুধু সফটওয়্যার বানালেই হবে না, বন্দর কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ লরিচালক বা মাঠের সিঅ্যান্ডএফ কর্মীদের প্রযুক্তিগতভাবে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে।

 

পণ্য খালাসের প্রতিটি ধাপ সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করার এই চূড়ান্ত মিশন দেশের প্রধান অর্থনৈতিক লাইফলাইনকে কত দ্রুত গতিশীল ও সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করতে পারে, এখন ব্যবসায়ী মহলের নজর সেদিকেই।

৫০০ কোটি টাকার ঐতিহাসিক স্টার্টআপ তহবিল ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

কাগজহীন হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর, ডিসেম্বরের মধ্যে স্মার্ট পোর্ট গড়ার মিশন

আপডেট সময় : ০৭:০০:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শতভাগ ডিজিটালাইজেশনের পথে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক লাইফলাইন; দীর্ঘদিনের সনাতন ফাইল-সংস্কৃতি বাতিলের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও মাঠপর্যায়ে কারিগরি অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে রয়েছে বাস্তব শঙ্কা

রাসেল চৌধুরী

টেবিল থেকে টেবিলে নথির দৌড়াদৌড়ি, কাগজপত্রের পাহাড়, পণ্য খালাসের জন্য সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের দীর্ঘ অপেক্ষা আর ট্রাক-লরির চিরচেনা জটলা—দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের এই চেনা दृश्यপট এবার আমূল বদলে যাচ্ছে। আগামী ডিসেম্বর ২০২৬ সালের মধ্যে পুরো বন্দরকে শতভাগ ‘পেপারলেস’ বা কাগজহীন আধুনিক ‘স্মার্ট পোর্ট’-এ রূপান্তরের চূড়ান্ত লক্ষ্য বেঁধে দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ)। নতুন এই সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার ফলে আমদানি-রপ্তানির বিল পরিশোধ থেকে শুরু করে কনটেইনারের গেট পাস—সব ধরনের দাপ্তরিক ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পুরোপুরি চলে আসছে স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল নেটওয়ার্কে।

 

দীর্ঘদিনের সনাতন ও আমলাতান্ত্রিক ফাইল-সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার এই বিশাল রূপান্তরকে দেশের ব্যবসায়ী মহল স্বাগত জানালেও, মাঠপর্যায়ের কারিগরি অবকাঠামো, সার্ভার ব্যাকআপ এবং ব্যবহারকারীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিয়ে অংশীজনদের মধ্যে কিছু বাস্তব সংশয় ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

 

বন্দর ভবন সূত্রে জানা গেছে, বন্দরে আসা বিদেশি জাহাজের ভেসেল বিল ইতোমধ্যে শতভাগ অনলাইনে নেওয়া শুরু হয়েছে। এখন কনটেইনার ও আমদানিকারকদের কনসাইনি বিলও সরাসরি ‘টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম এর আওতায় এনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিশোধের ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হচ্ছে।

 

এই ডিজিটাল মিশনের সবচেয়ে বড় মাইলফলক হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আওতাধীন কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের সাথে বন্দরের টিওএস অ্যাপের সরাসরি রিয়েল-টাইম সংযোগ। এর ফলে কোনো চালানে জালিয়াতি বা শুল্কসংক্রান্ত জটিলতা থাকলে কাস্টমস তাদের সিস্টেমে কনটেইনার লক বা হোল্ড করার সাথে সাথেই বন্দরেও ফাইলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত হয়ে যাবে। এতে আগের মতো কাস্টমস ও বন্দরের মধ্যে ম্যানুয়াল নথিপত্র চালাচালির পেছনে দিনের পর দিন সময় অপচয় হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না।

 

প্রতিদিন বন্দরে পণ্য খালাস ও নিতে এসে হাজার হাজার ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানকে গেট পাসের ম্যানুয়াল যাচাইয়ের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। নতুন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় শতভাগ ই-গেট পাস, গেট ইন-আউট ট্র্যাকিং, অনলাইন কার্ট টিকিট এবং সুনির্দিষ্ট সময় ধরে গাড়ি প্রবেশের ‘টাইম স্লট ম্যানেজমেন্ট’ জোরদার করা হচ্ছে। ফলে বন্দর এলাকার চিরচেনা ট্রাফিক জটলা ও অযাচিত বিলম্ব অনেকাংশে কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্মেলনকক্ষে চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় কর্মকর্তাদের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে কোনো ডেস্কে বা ফাইলে যেন অযথা ম্যানুয়াল পদ্ধতি ধরে রাখা না হয়। তাছাড়া ‘পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের ব্যবস্থা করায় ব্যবসায়ীরা যেকোনো স্থান থেকে তাদের নথির লাইভ আপডেট আছে, তা সহজেই ট্র্যাক করতে পারছেন।

 

কাগজে-কলমে এই সর্বাধুনিক প্রযুক্তিকে স্বাগত জানালেও মাঠপর্যায়ে এর সফল বাস্তবায়ন নিয়ে খাত সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ তাড়া করে বেড়াচ্ছে। চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় বন্দরের টিওএস কিংবা কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা সার্ভার ডাউন থাকে বা কারিগরি ধীরগতি দেখা দেয়। সিস্টেম আধুনিক হলেও যদি নিরবচ্ছিন্ন ব্যাকআপ ও দক্ষ জনবল দ্রুত নিশ্চিত করা না যায়, তবে সার্ভার জটের কারণে পণ্য খালাসে উল্টো সময় বেশি লেগে যেতে পারে।

 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, অতীতে ব্যাংকিং চ্যানেলে অনলাইন পেমেন্ট বা কনটেইনার ছাড়ের কিছু নিয়মে কড়াকড়ি আরোপের কারণে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, কারিগরি ত্রুটির কারণে যেন তার পুনরাবৃত্তি না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

 

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক এক পরিচালক বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর যদি সত্যি আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণ পেপারলেস হতে পারে, তবে তা দেশের আমদানি-রপ্তানির ‘লিড টাইম’ (পণ্য পৌঁছানোর সময়) ও ব্যবসার খরচ একধাক্কায় অনেক কমিয়ে দেবে। তবে শুধু সফটওয়্যার বানালেই হবে না, বন্দর কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ লরিচালক বা মাঠের সিঅ্যান্ডএফ কর্মীদের প্রযুক্তিগতভাবে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে।

 

পণ্য খালাসের প্রতিটি ধাপ সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করার এই চূড়ান্ত মিশন দেশের প্রধান অর্থনৈতিক লাইফলাইনকে কত দ্রুত গতিশীল ও সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করতে পারে, এখন ব্যবসায়ী মহলের নজর সেদিকেই।