রাসেল চৌধুরী
দেশের বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) আমদানি ও সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক। নথিপত্র বলছে, চাহিদাকে ছাড়িয়ে দেশের প্রধান গুদাম ও ডিলার পয়েন্টগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস মজুত রয়েছে। অথচ মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো এবং সাধারণ মানুষের জন্য চরম ভোগান্তির। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে খুচরা বাজারে প্রতিটি ১২ কেজির সিলিন্ডার ৪০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
কোথাও কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখা হয়েছে। এই চরম নৈরাজ্য রুখতে এবার সরাসরি মাঠে নামছে প্রশাসন। বিইআরসি, জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) যৌথভাবে অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসের জন্য বিইআরসি প্রতি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১,৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খুচরা বাজারে তা ২,১০০ টাকা থেকে শুরু করে ২,৬০০ টাকা এবং বিশেষ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২,৯০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে।
এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটে তীব্র টান পড়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী দেশের সব জেলা প্রশাসককে (ডিসি) অনলাইন সভার মাধ্যমে বাজার কঠোরভাবে মনিটরিং করার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। অসাধু ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে কারসাজির প্রমাণসহ দ্রুত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, দেশে এলপিজির কোনো ঘাটতি নেই। গত আগস্টে ১ লাখ ৫৮ হাজার ও সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন গ্যাস আমদানি করা হয়েছে, যা দেশের মোট চাহিদার চেয়েও বেশি। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো অপারেটর, ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা বেশি দাম নেয় কিংবা অবৈধ মজুত করে, তবে তা দেশের প্রচলিত আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। আমরা অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনকে পূর্ণ সহযোগিতা করছি।
জ্বালানী বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, বিইআরসির নির্ধারিত দামে বাজারে কখনোই এলপিজি পাওয়া যায় না। বিইআরসি, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর ও প্রতিযোগিতা কমিশনের কার্যকর নজরদারি ও সমন্বয়ের অভাব থাকায় এই অসাধু সিন্ডিকেট বাজারে রাজত্ব করছে। শুধু লোকদেখানো হুঁশিয়ারি নয়, প্রয়োজনে কারসাজিতে জড়িতদের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে নতুনদের সুযোগ দিতে হবে। এলপিজি ব্যবসা কারও ব্যক্তিগত বা পৈতৃক সম্পত্তি নয় যে সাধারণ ভোক্তাদের জিম্মি করে ইচ্ছামতো দাম রাখা হবে।
খুচরা বিক্রেতাদের দাবী আমরা নিরুপায়। কোম্পানি ও বড় ডিলারদের কাছ থেকেই আমাদের বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে [লোয়াব]। রসিদে সরকার নির্ধারিত দাম লেখা থাকলেও, অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। আমরা যদি বেশি দামে কিনি, তবে কম দামে বিক্রি করব কীভাবে? আমাদের ওপর দায় চাপানো সহজ, কিন্তু গোড়ার সিন্ডিকেট কেন ভাঙা হচ্ছে না?
চট্টগ্রামের সাধারণ ভোক্তাদের দাবী, সরকার কাগজে-কলমে দাম কমায়, আর বাজারে গেলে দাম বাড়ে [লোয়াব]। ১,৫৮৫ টাকার সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ২,৩০০ টাকায় [লোয়াব]। সরকার দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার পর যদি বাজারে তার প্রতিফলন না থাকে, তবে এই নিয়মের লাভ কী? সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এই উৎসব দেখার যেন কেউ নেই।
বিইআরসি ও কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই দুই মাসেই দেশে এলপিজির আমদানি ছিল চাহিদার তুলনায় সন্তোষজনক [লোয়াব]। এই বিপুল পরিমাণ আমদানির বিপরীতে বিইআরসি প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম আগস্টে ১,৫৯৮ টাকা এবং সেপ্টেম্বরে ১,৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করে দেয় [লোয়াব]। কিন্তু ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের পাল্টাপাল্টি ব্লেম-গেম বা কাদা ছোড়াছুড়ির কারণে ভোক্তাদের সিলিন্ডারপ্রতি অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে পরিবহন খরচ বা আন্তর্জাতিক কার্গো প্রিমিয়াম বাড়লেও [লোয়াব], দেশে বর্তমানে যে গ্যাস মজুত আছে তা দিয়ে কোনোভাবেই এই মুহূর্তে দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। মধ্যস্বত্বভোগীদের কৃত্রিম সংকট এবং সরবরাহ চেপে রাখার প্রবণতাই বাজারে এই অস্থিরতা তৈরি করেছে। স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, লাইসেন্স বাতিল এবং জরিমানা বা আইনি জেল নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তি সহজে দূর হবে না।













