আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ক্ষমতা ও ভাগ্যের পরিহাস কাকে বলে, তার এক জীবন্ত উদাহরণ তৈরি হলো রাজস্থানের আজমের সেন্ট্রাল জেলে। যে কারাগারের ভেতরের হাজারো বন্দির ভাগ্য একসময় নিয়ন্ত্রিত হতো তাঁর একটিমাত্র কলমের খোঁচায়, যার কড়া নজরদারিতে চলতো জেলের প্রতিটি কোণ—আজ লোহার সেই একই গরাদ আর চারদেয়ালের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি জীবন কাটছে তাঁর নিজেরই। তিনি আর কেউ নন, আজমের সেন্ট্রাল জেলের সাবেক নারী জেলার দিব্যা চৌধুরী।
নিজের পদের অপব্যবহার করে কারাগারকে ‘ব্যক্তিগত দাস তৈরির কারখানা’ বানানোর চেষ্টার দায়ে গ্রেফতার হয়ে এখন আদালতের নির্দেশে নিজেরই সাবেক কর্মস্থলে কয়েদির পোশাক পরে দিন কাটাচ্ছেন ৩৭ বছর বয়সী এই সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বামী থেকে দূরে আজমেরে দুই ছোট মেয়েকে নিয়ে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন দিব্যা। একা সংসার সামলানোর অজুহাতে তিনি জেলের নিয়ম-কানুনকে বুড়ো আঙুল দেখানোর সিদ্ধান্ত নেন। নিজের ব্যক্তিগত গৃহস্থালির কাজের জন্য তিনি ‘মহিলা সংশোধন কেন্দ্র’ থেকে বেছে নেন দুজন বন্দিকে—যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কিরণ এবং বিচারাধীন বন্দি সানা। ক্ষমতার দম্ভে তিনি ভেবেছিলেন, জেলের কয়েদিদের দিয়ে ঘরের কাজ করালেও কেউ মুখ খোলার সাহস পাবে না।
গত ১২ জুলাই রাতে নিজের চক্রান্ত বাস্তবায়ন করতে যান দিব্যা। সহযোগী নারী কনস্টেবল সোনিয়া চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে দুই কয়েদিকে জেলের বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু বিধি বাম! কারাফটকে ডিউটিতে থাকা সৎ ও অনড় রক্ষীরা তাদের পথ আটকে দাঁড়ান। শুরু হয় তীব্র বাগবিতণ্ডা। অভিযোগ রয়েছে, জেলার দিব্যা চৌধুরী নিজের পদের ভয় দেখিয়ে ও রক্ষীদের ওপর চড়াও হয়ে বন্দিদের নিয়ে যাওয়ার জেদ ধরেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি; সহকর্মীদের কড়া আপত্তিতে ভেস্তে যায় তার এই বেআইনি পরিকল্পনা।
এই ঘটনার পর তোলপাড় শুরু হয় কারা প্রশাসনে। তদন্তে দিব্যার পদের অপব্যবহার, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বেআইনিভাবে বন্দি সরানোর চেষ্টার প্রমাণ মেলে। আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলেছে। খাকি উর্দি পরা প্রতাপশালী জেলার দিব্যা চৌধুরীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
সবচেয়ে বড় নাটকীয়তা তৈরি হয় যখন আদালত মামলার শুনানি শেষে তাকে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ঠিকানায় লেখা হয়—’আজমের সেন্ট্রাল জেল’।
কারা সূত্রের খবর, দিব্যা চৌধুরীকে এখন সেই সাধারণ বন্দিদের কাতারেই রাখা হয়েছে, যাদের ওপর কিছুদিন আগেও তিনি হুকুম চালাতেন। যে বন্দিদের নিয়ম ও শৃঙ্খলার পাঠ তিনি নিজে পড়াতেন, আজ তাদেরই চোখের সামনে একজন অপরাধী হিসেবে দিন পার করছেন তিনি।
ক্ষমতার দম্ভ কীভাবে একজন মানুষকে সাফল্যের চূড়া থেকে অন্ধকূপের বন্দি বানিয়ে দিতে পারে—জেলার দিব্যার এই পতন যেন তারই এক নির্মম ও জীবন্ত দলিল।













