
শিশু নাহিদ। বয়স ১০-১১ বছর। এ বয়সে হাতে বইখাতা আর কলম থাকার কথা। সেই কোমল হাতে ধরেছে রিকশা। বাবা খালেক প্রতিবন্ধী। মা দিনমজুর। বাবার চিকিৎসা আর সংসারের বোঝা মাথায় চেপেছে শিশু নাহিদ হাসান মেহেদির। তাই এ বয়সে রিকশা চালিয়ে সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হয়েছে সে। যশোর শহরতলি ঝুমঝুমপুর বাবলাতলা পশ্চিম পাড়ার আব্দুল খালেকের ছেলে সে। যেখানে তারা থাকে, সেটি তাদের নিজেদের বাড়ি নয়। ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকে। বাড়ির মালিক মামুনুর রশিদ। নাহিদ কেবল রিকশা চালায় না, লেখাপড়াও করে। সে বালিয়াডাঙ্গা ইবতেদায়ি মাদরাসায় তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। নাহিদ জানায়, সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সে কাস করে। এরপর বাড়ি থেকে রিকশা নিয়ে বের হয়।
এ বয়সে কেন রিকশা চালায় জানতে চাইলে বলে, পরিবারের অন্য সদস্যদের আয়ে সংসার চলে না। তা ছাড়া বাবা পঙ্গু, তার চিকিৎসার খরচও রয়েছে। পাশাপাশি এই রিকশার কিস্তি দিতে হয়।
নাহিদের দাদাবাড়ি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার খলসি গ্রামে। তারা তিন ভাই। বড় ফয়সাল, ট্রাকের হেলপার হিসেবে কাজ করে। মেজো সাজ্জাদ হোসেন, মাঝে মধ্যে সেও রিকশা চালায়। ভাইদের মধ্যে তৃতীয় নাহিদ।
নাহিদের মা জেসমিন বেগম। তিনি বিসিক শিল্প এলাকায় একটি বিস্কুট ফ্যাক্টরিতে দিনহাজিরা হিসেবে কাজ করেন। কাজ হলে ১৩০ টাকা মজুরি পান।
আব্দুল খালেক মাঝে মধ্যে তার ইঞ্জিনচালিত রিকশাটি বের করেন। শারীরিক অবস্থা ভালো না থাকায় নিয়মিত রিকশা চালাতে পারেন না। সম্প্রতি স্থানীয় একটি সমিতি থেকে তিনি ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ইঞ্জিনচালিত রিকশাটি কিনেছেন। এ খাতে প্রতিদিন তাকে ২০০ টাকা হারে কিস্তি শোধ করতে হয়। প্রতিদিন যা আয় হয় তা থেকে সংসারের খরচ মেটানো বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। ঘরভাড়া বাবদ এক হাজার ২০০ টাকা দিতে হয় প্রতি মাসে।
আব্দুল খালেক জানান, সাত-আট বছর আগে তিনি ঘোড়ার গাড়ি থেকে পড়ে আহত হন। এরপর আবার নসিমন থেকে পড়ে মেরুদণ্ডে আঘাত পান। সে কারণে তার হাত-পা মাঝে মধ্যে অবশ হয়ে যায়। তিনি জানান, চিকিৎসার জন্য এখন পর্যন্ত প্রায় আট লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এখনো প্রতি মাসে ওষুধের একটা বড় খরচ বহন করতে হয়। বাজারে তার দেনা প্রায় দেড় লাখ টাকা। গ্রামের বাড়ির জমি বিক্রি করেছেন; বাকি জমি বন্ধক রেখে চিকিৎসায় খরচ করেছেন।
আব্দুল খালেকের বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সিপাহি আজিজুল হক। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা হিসেবে খালেকরা পাঁচ ভাই ১০ হাজার টাকা পান। কিন্তু ভাগের ভাগ হিসেবে খালেকের ভাগে পড়ে এক হাজার ৬০০ টাকা। তিনি বলেন, ‘শরীর যখন খুব খারাপ হয়ে যায়, তখন বিছানা থেকে উঠতে পারি না। তখন মাঝে মধ্যে মেজো ছেলে ও ছোট ছেলে রিকশা চালায়। তবে বেশির ভাগ সময় আমাকে শুয়ে-বসেই কাটাতে হয়।’ স্থানীয় বাসিন্দা এবং নাহিদদের প্রতিবেশী রুস্তম আলী বলেন, ‘ছেলেটা এতটুকু বয়সে রিকশা চালায়, দেখতে খারাপও লাগে। তবে তারা খুব ভালো।’
বালিয়াডাঙ্গা ইবতেদায়ি মাদরাসার সহকারী শিক্ষক আসমা খাতুন বলেন, ‘ছেলেটি এবার ভর্তি হয়েছে। মাদরাসা থেকে বিনামূল্যে বই দেয়া হয়েছে। ছাত্র ভালোই, তা ছাড়া শান্তশিষ্টও। শুনেছি কাস শেষে সে মাঝে মধ্যে রিকশাও চালায়।’
তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রের মাথায় সংসারের বোঝা!
জনপ্রিয় সংবাদ














