গণপরিবহনে নৈরাজ্য,কাঁচাবাজারে আগুন, দিশেহারা বন্দরনগরী
রাসেল চৌধুরী
লিটারপ্রতি এক লাফে ২০ টাকা! গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া জ্বালানি তেলের এই নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি দেশের প্রধান বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের জীবনে এক তীব্র অর্থনৈতিক সুনামি বয়ে এনেছে। নগরের জিইসি মোড়ের অভিজাত ফ্ল্যাটের উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে শুরু করে বহদ্দারহাটের বস্তিবাসী রিকশাচালক কিংবা চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের দিনমজুর কারো পকেটই রেহাই পাচ্ছে না জ্বালানির এই আগুনের আঁচ থেকে।
নগরের খাতুনগঞ্জে পিঠে বস্তা তোলা দিনমজুর ইসমাইল হোসেনের (৪৫) চোখে-মুখে আজ কেবলই অন্ধকার। দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয়ের এই মানুষটি বলেন, আঁরা দিন আনি দিন খাই। তেলের দাম বাড়ার পর থাইক্যা সকালে যে চাল ৬০ টাকা ছিল, হেইডা এহন ৬৫ টাকা। তেলের দাম বাড়লে চাউল-ডাইলের দাম ক্যান বাড়ে, হেইডা তো বুঝি না বাজি! এহন কি না খাইয়া থাকুম?”
একই অবস্থা নগরের রিকশাচালক কাসেম মিয়ার। তেলের দাম বাড়ায় চকবাজার থেকে নিউমার্কেটগামী যাত্রীরা রিকশা ভাড়া আগের চেয়ে ১০-২০ টাকা বেশি দিতে নারাজ, অথচ কাসেম মিয়ার নিজের দুপুরের খাবারের হোটেলের বিল এক ধাক্কায় ১০ টাকা বেড়ে গেছে।
জ্বালানির এই তীব্র আঘাত শুধু নিম্নবিত্তেই সীমাবদ্ধ নেই, মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তদের চিরচেনা হিসাবনিকাশও ওলটপালট করে দিয়েছে।
আগ্রাবাদ এলাকার একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা রাইহানুল ইসলাম জানান, আগে যেখানে ব্যক্তিগত গাড়িতে মাসে ১৫ হাজার টাকার অকটেন লাগতো, নতুন দামে এখন তা ২০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাবে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বেতন তো বাড়েনি। বাধ্য হয়ে বাচ্চার স্কুলের খরচ আর নিজের যাতায়াত বাজেটে বড় ধরনের কাটছাঁট করতে হচ্ছে। আমরা না পারছি লাইনে দাঁড়িয়ে কম দামে টিসিবির পণ্য কিনতে, না পারছি এই খরচ সামলাতে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় কর্তৃক নতুন ভাড়ার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা করা হয়েছে। মহানগরে বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাসে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে অতিরিক্ত ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এটি নিয়ে প্রতিদিন মোড়ে মোড়ে কন্ডাক্টর ও যাত্রীদের মধ্যে হাতাহাতি-বাগবিতণ্ডা নিত্যদিনের চিত্র।
চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় রুটের লঞ্চ ভাড়া ৭.৫৪% বাড়ানো হয়েছে। প্রথম ১০০ কিলোমিটারের জন্য প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২.৯৫ টাকা থেকে বেড়ে ৩.১৮ টাকা হয়েছে। পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে পণ্যবাহী প্রাইম মুভার ও কন্টেইনার পরিবহন খরচ প্রায় ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে。 এছাড়া চট্টগ্রামের বেসরকারি কন্টেইনার ডিপো (ICD) গুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়ায় ৯.৮৫% ফুয়েল সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।
পরিবহন ও সরবরাহ খরচ বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের পাইকারি ও খুচরা বাজারে। রিয়াজউদ্দিন বাজারে সবজি কিনতে আসা স্কুলশিক্ষক সুকোমল বড়ুয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পরিবহন খরচের অজুহাতে কেজিপ্রতি সবজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে বিক্রেতারা। বাজার যেন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য এক ‘মৃত্যুকূপ’।
নগরের পাইকারি আড়ত খাতুনগঞ্জ ও খুচরা বাজার রিয়াজউদ্দিন বাজারের বর্তমান চিত্র: খাতুনগঞ্জে পাইকারিতে নাজিরশাইল/মিনিকের চাল ৬০-৬২ টাকা হলেও খুচরা বাজারে তা ৬৮-৭৫ টাকায় ঠেকেছে। উন্নত জাতের মসুর ডাল খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ১১০-১২০ টাকা কেজিতে। খোলা সয়াবিন তেল খুচরা বাজারে প্রতি লিটার ১৬сно৫-১৭০ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৮০-৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে আলু প্রতি কেজি ৪৫-৫০ টাকা এবং ফার্মের ডিম প্রতি ডজন ১৫০-১৬০ টাকায় উঠেছে। কাঁচা মরিচের কেজি ঠেকেছে ১৮০-২০০ টাকায়।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এই মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে বলেন, জ্বালানি তেলের এই দাম বৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে এবং সাধারণ মানুষের পারিবারিক বাজেটকে চরমভাবে পিষ্ট করবে। বিশেষ করে ডিজেল-নির্ভর কৃষি খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে; সেচ, যান্ত্রিকীকরণ এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে খাদ্যপণ্যের দাম আরও আকাশচুম্বী হবে। ফলে একদিকে উৎপাদনকারীদের লাভ কমবে, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর তৈরি হবে অসহনীয় চাপ।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে অজুহাত বানিয়ে ব্যবসায়ীরা যাতে কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত মুনাফা লুটতে না পারে, সেজন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নগরের বিভিন্ন বাজার ও বাস টার্মিনালে একযোগে বিশেষ মনিটরিং ও মোবাইল কোর্ট অভিযান শুরু হয়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) জানিয়েছেন, রিয়াজউদ্দিন বাজার, খাতুনগঞ্জ ও বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারে মূল্যের তালিকা টাঙানো নিশ্চিত করতে এবং গণপরিবহনে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায়কারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রজ্ঞাপন অমান্য করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং পণ্যের কৃত্রিম দাম বাড়ানোর দায়ে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু পরিবহন ও খুচরা ব্যবসায়ীকে মোটা অঙ্কের জরিমানা করা হয়েছে। বাজার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের এই তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।













