চট্টগ্রাম সিআরবিতে ডিসিওর সরকারি বাসভবন ঘিরে ৪ কোম্পানির সিন্ডিকেট
• আইনি নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে চলছে রমরমা বাণিজ্য
• নীরব রেল প্রশাসন
ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব
ইকবাল উদ্দিন ভুঁইয়া :
সরকারি বরাদ্দকৃত বাংলোর মূল কাজ কর্মকর্তার আবাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু দেশের আইন ও বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চট্টগ্রাম রেলওয়ে অফিসার্স কলোনির একটি সরকারি বাংলো পরিণত হয়েছে বেসরকারি টাইলস কোম্পানির বিশাল বাণিজ্যিক গুদামে। বাংলাদেশ রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (ডিসিও) তৌষিয়া আহমেদের বরাদ্দকৃত ‘ই-৭১’ নম্বর বাংলোর সম্মুখভাগ দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ‘পার্কিং টাইলস’-এর এই অবৈধ আড়ত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারের ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ অনুযায়ী কোনো রেল কর্মকর্তাকে বরাদ্দ দেওয়া আবাসিক বাংলো বা তার অংশবিশেষ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের বা উপ-ভাড়া দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অথচ দীর্ঘদিন ধরে গভীর রাতে ও ভোরে লোকচক্ষুর অন্তরালে বড় বড় ট্রাক বোঝাই করে এখানে টাইলস এনে মজুত করছে চারটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো— কাজী টাইলস, জিএস টাইলস, এমকে টাইলস এবং এলিট পার্কিং টাইলস। এই বাংলোর আঙিনা থেকেই প্রতিদিন ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্যিক টাইলস।
অনুসন্ধানের শুরুতে অবৈধ এই গুদামের প্রাথমিক তথ্য মেলে কাজী টাইলসের এক স্টাফের কাছ থেকে। তার দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে কাজী টাইলসের ম্যানেজার তানভীরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “এই গুদামে আমরা একা নই, আরও চারটি প্রতিষ্ঠান আছে। তবে এই জায়গাটির মূল পরিচালক ও নিয়ন্ত্রক এলিট টাইলস।”
এরপর এলিট টাইলসের ম্যানেজার জামালের সাথে কথা বললে তিনি রেলের সম্পত্তি দখলের পক্ষে অদ্ভুত এক যুক্তি দাঁড় করান। জামাল দাবি করেন, “পরিত্যক্ত রেলওয়ে সম্পদ আমরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ব্যবহার করছি।” সরকারি সম্পদ ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করা যায় কিনা—জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট জবাব না দিয়ে বলেন, “মালিক ভালো জানেন।” পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে এই ম্যানেজার সাংবাদিকদের সাথে চরম অসদাচরণ করেন।
টানা দুই দিনের প্রচেষ্টায় এলিট টাইলসের মালিক মোহাম্মদ কাজী বোরহানের মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে যান। পরে তাকে ফোনে পাওয়া গেলে তিনি এক চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক দাবি করেন। কাজী বোরহান বলেন, “এটা আমরা রেলওয়ে কর্মকর্তার কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করছি।” তবে ঠিক কোন কর্মকর্তার পকেটে এই ভাড়ার টাকা যাচ্ছে, সেই প্রশ্ন করতেই তিনি তড়িঘড়ি করে ফোনের লাইন কেটে দেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিদ্যমান ‘রেলওয়ে সম্পত্তি (অবৈধ দখল উদ্ধার) আইন, ২০১৬’-এর অত্যন্ত স্পষ্ট লঙ্ঘন এটি।এই আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, রেলওয়ের কোনো সম্পত্তি অনুমতি ছাড়া নিজের দখলে রাখা বা ব্যবহার করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ, যার শাস্তি অনধিক ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ড। একই আইনের ৫ ধারা মোতাবেক, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা ব্যক্তি যদি এই অবৈধ দখলে সহায়তা করেন, তবে তিনিও সমভাবে অপরাধী এবং তার জন্য অনধিক ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী রেলের জায়গায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাতে হলে ভূ-সম্পত্তি বিভাগের সুনির্দিষ্ট ইজারা বা লাইসেন্স থাকতে হয়। কোনো আবাসিক বাংলোর ভেতরে বা সামনে এমন বাণিজ্যিক আড়ত খোলার কোনো আইনি এখতিয়ার কারো নেই।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (ডিসিও) তৌষিয়া আহমেদের কার্যালয়ে যাওয়া হলে তিনি ক্যামেরার সামনে কোনো বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।তবে অফ-দ্য রেকর কথোপকথনে তিনি বাংলোর সম্মুখভাগ টাইলসের গুদাম হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। এর সপক্ষে এক অদ্ভুত যুক্তি দিয়ে তিনি দাবি করেন, “ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে” তিনি ব্যবসায়ীদের এই জায়গাটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। তবে একজন ডিসিও পদমর্যাদার কর্মকর্তা হয়েও সরকারের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি এভাবে ব্যক্তিগত ‘নিরাপত্তা’র অজুহাতে বেসরকারি কোম্পানিকে টাইলসের হাট বসাতে দিতে পারেন কিনা—এমন আইনি ও নৈতিক প্রশ্নের মুখে তিনি আর কোনো উত্তর দেননি।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) যেখানে প্রতিনিয়ত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দিচ্ছেন, সেখানে খোদ বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তার বাংলোর ভেতরেই এমন বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য চলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ রেল কর্মচারীরা। সরকারি সম্পদকে ব্যক্তিগত ব্যবসার পুঁজি বানিয়ে কারা পকেট ভারী করছে, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।













