মুখোমুখি ফখরুল-অলি, কার মাথায় উঠছে সাংবিধানিক মুকুট?
রাসেল চৌধুরী :
দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র খরা কাটিয়ে এক অনন্য ইতিহাসের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফেরার পর যে ব্যালট বাক্স শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল, দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আজ ২০ আগস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার আবারও সেই ব্যালট যুদ্ধ ফিরে এলো রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের আঙিনায়。 দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই মহা-লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছেন দেশের রাজনীতির দুই হেভিওয়েট ব্যক্তিত্ব—বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও দলের সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বীর বিক্রম。
আজ দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের মূল সংসদ কক্ষে এই ঐতিহাসিক ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে。 প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য তাদের মহামূল্যবান ভোট দিয়ে নির্ধারণ করবেন কে বসছেন বঙ্গভবনের সর্বোচ্চ আসনে। সংসদ সচিবালয় সূত্রের খবর, ভোট শুরুর ঠিক ৫ মিনিট আগে থেকে এবারই প্রথম সংসদ কক্ষ থেকে সরাসরি সম্প্রচারের (লাইভ টেলিকাস্ট) বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা দেশের সংসদীয় ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন এক মাত্রা যোগ করছে।
১৯৯১ সালে বিএনপির আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগের বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীর মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর থেকে যতবারই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এসেছে, প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দলের একক প্রার্থী থাকায় ভোটগ্রহণের কোনো প্রয়োজন পড়েনি; সবাই নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সংস্কারের আবহে এবার রাজনৈতিক মেরুকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে। কোনো দলের ওয়াকওভার না নেওয়ার এই অনড় সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক এবং অর্থবহ একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য (চট্টগ্রাম-৪ আসনের জটিলতার কারণে মোট ৩৫০ আসনের একটি স্থগিত রয়েছে)। তবে কাগজের কলমে এবং সংসদীয় সংখ্যার হিসাবে দৃশ্যত অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সংসদে দলভিত্তিক আসন বিন্যাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বিএনপি ও সমমনা শিবিরের নিজস্ব সংসদ সদস্য সংখ্যা ২৪৭ জন। এর বাইরেও কিছু ছোট দল ও স্বতন্ত্রদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে মির্জা ফখরুলের পক্ষে। ১১-দলীয় ঐক্য জোটে অন্যদিকে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মূল চালিকাশক্তি হলো জামায়াতে ইসলামীর ৭৭ জন সংসদ সদস্য এবং জোটের অন্যান্য দল মিলিয়ে মোট ৯০ জন সদস্যের সমর্থন। অন্যান্যজাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এর ৮ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ৩ জন এবং অন্যান্য স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা রয়েছেন কিং-মেকারের ভূমিকায়।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকায় তাত্ত্বিকভাবে সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার (ক্রস-ভোটিং) কোনো সুযোগ নেই। ফলে মির্জা ফখরুল ইসলামের বিজয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করা হলেও, জামায়াত ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) এই জোটবদ্ধ লড়াই নির্বাচনটিকে একটি তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এবারের ব্যালট পেপার সাধারণ নির্বাচনের মতো নয়। সাদা কাগজের ওপর কালো কালিতে ছাপা বিশেষ এই ব্যালটের দুটি অংশ থাকবে। প্রথম অংশে থাকবে সংসদ সদস্যের নাম, বিভক্তি নম্বর ও স্বাক্ষর। দ্বিতীয় অংশে দুই প্রার্থীর নাম বাংলা বর্ণমালার ক্রমানুসারে সাজানো থাকবে। সংসদ সদস্যরা গোপনীয় বুথে গিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে ব্যালট বাক্সে ফেলবেন। বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর সংসদ কক্ষেই গণনা সম্পন্ন করে আজই প্রাথমিক ফল ঘোষণা করবেন সিইসি।
নির্বাচন সংস্কার কমিশনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু একজন ব্যক্তি বাছাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়। যদি জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী সংস্কার রূপরেখা বা ‘জুলাই চার্টার’ বাস্তবায়িত হয়, তবে আগামীতে রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা এবং প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য অনেক বৃদ্ধি পেতে পারে। সেই সুদূরপ্রসারী হিসাব মাথায় রেখেই দুই পক্ষই মাঠ ছাড়তে নারাজ।
রাজনীতি থেকে দীর্ঘ অবসরের ঘোষণা দেওয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্য এটি যেমন তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের চূড়ান্ত স্বীকৃতি হতে পারে, তেমনি বীর মুক্তিযোদ্ধা অলি আহমদের জন্য এটি তাঁর দীর্ঘ সংসদীয় লড়াইয়ের এক নতুন পরীক্ষা। আজ বিকেলেই নির্ধারিত হয়ে যাবে, দীর্ঘ ৩৫ বছরের খরা কাটিয়ে ব্যালটের মাধ্যমে কার মাথায় উঠতে যাচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক মুকুট।













