রাসেল চৌধুরী
কোনো পূর্ব নোটিশ কিংবা প্রটোকল ছাড়াই আচমকা চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন (বকুল)। তপ্ত দুপুরে হাসপাতালের মেঝে আর বারান্দায় শয্যা সংকটে তীব্র গরমে রোগীদের ছটফটানির এমন দৃশ্য দেখে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি ।
সাবেক এই মহকুমা শহরের লাখ লাখ মানুষের চিকিৎসার এমন বেহাল দশা দেখে মন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে ঘোষণা দেন, পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে জরুরি ভিত্তিতে ১৫০ শয্যার একটি সর্বাধুনিক ‘মডেল হাসপাতালে’ উন্নীত করা হবে । একই সাথে আগামী দুই বছরের মধ্যে এখানে ১০টি শয্যা ও ১০টি মেশিন সংবলিত একটি সর্বাধুনিক ডায়ালাইসিস ইউনিট চালুরও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি ।
শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে আকস্মিক এই পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ড এবং বহির্বিভাগ ঘুরে দেখেন এবং সরাসরি চিকিৎসাধীন সাধারণ রোগীদের সাথে কথা বলেন।
পরিদর্শনকালে মন্ত্রীকে নিজ হাতে হাসপাতালের ভর্তি থাকা রোগীদের খাবারের মান পরীক্ষা করে দেখতে দেখা যায় এবং রোগীদের দেওয়া দুপুরের খাবার মুখে নিয়ে এর স্বাদ ও পুষ্টিগুণ যাচাই করেন ।
মেঝেতে শয্যা পেতে থাকা রোগীদের কষ্ট দেখে মন্ত্রী চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “মাননীয় প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনায় আমি তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবার বাস্তব চিত্র দেখতে এখানে এসেছি। পটিয়ার নিজস্ব প্রায় ৭ লাখ মানুষের পাশাপাশি বাঁশখালী, চন্দনাইশ, আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর আরও ৪ লাখ মানুষ এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। অথচ সেবার মান ও অবকাঠামো এখনো থমকে আছে। সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগ আমি মেনে নেব না ।”
পরিদর্শনকালে পুরুষ ওয়ার্ডের মেঝেতে চিকিৎসাধীন পটিয়ার জিরি ইউনিয়ন থেকে আসা জয়নাল আবেদীন (৫২) নামের এক রোগী মন্ত্রীর হাত ধরে কেঁদে উঠে বলেন, “বাবা, তীব্র গরমে মেঝেতে শুয়ে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। ফ্যানের বাতাসও পাওয়া যায় না, ডাক্তার-নার্সদের ডাকলে ওনারাও সিট নাই বলে অসহায়ত্ব দেখান।” রোগীর এমন কথা শুনে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মন্ত্রী। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন, পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামোগত টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হতে কিছুটা সময় লাগলেও অন্তর্বর্তীকালীন সংকট সামাল দিতে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত শয্যার লজিস্টিক সাপোর্ট পাঠাতে হবে ।
দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য ও ডায়াগনস্টিক বাণিজ্যের কঠোর সমালোচনা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, “হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের সমস্ত রক্ত পরীক্ষা ও এক্স-রে হাসপাতালের ভেতরেই সম্পন্ন করতে হবে । কোনো ডাক্তার যদি বাইরের প্রাইভেট সেন্টারে রোগী পাঠান, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি ওষুধ ও স্যালাইন রোগীরা বিনামূল্যে পাচ্ছেন কি না, তা আমি নিজে মনিটর করব। ” হাসপাতালে চিকিৎসকদের শতভাগ উপস্থিতি না থাকায় তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে কৈফিয়ত তলব করেন এবং ডিউটি রোস্টার অনুযায়ী সবার উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।
মন্ত্রীর এই নির্দেশের পর পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আবু তৈয়ব নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, “স্যার, ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ২০০-র বেশি রোগী বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসেন এবং ইনডোরে ধারণক্ষমতার তিন গুণের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন । আমাদের পর্যাপ্ত জনবল, লজিস্টিক সাপোর্ট ও টেকনিশিয়ান নেই। আপনি যদি টেকনিশিয়ান ও প্রয়োজনীয় কিট দেন, তবে বাইরের পরীক্ষা শতভাগ বন্ধ করা সম্ভব হবে।”
পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাথে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব এনামুল হক এনাম। তিনি পটিয়াবাসীর স্বাস্থ্য সংকটের চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রীকে বলেন, পটিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান ও মহাসড়কের দুর্ঘটনার বিষয়টি বিবেচনা করে এখানে একটি আধুনিক ট্রমা সেন্টার ও আইসিইউ (ICU) ইউনিট স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি । স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে এসে পটিয়া হাসপাতালকে সুসজ্জিত ও আধুনিক করার যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে তারা আশাবাদী ।
পরিদর্শনকালে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি, চট্টগ্রামের জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পিএস এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার এবং পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হকসহ স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ ।













