ঢাকা ১২:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিডিএর মাস্টারপ্ল্যানে শুভঙ্করের ফাঁকি চান না মেয়র, জোর ‘নগর সরকারে’

  • আপডেট সময় : ০৬:৩৩:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 58

জাঁকজমকপূর্ণ খসড়া নয়, মাঠের বাস্তবতায় মহাপরিকল্পনা সাজানোর কঠোর আলটিমেটাম চসিকের

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রস্তাবিত ২০২৫-২০৫০ মেয়াদের নতুন খসড়া মহাপরিকল্পনা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে একে আমূল পরিবর্তনের তাগিদ দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অতীতে একের পর এক মাস্টারপ্ল্যান করা হলেও সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা ও বাস্তববিমুখতার কারণে নগরবাসী শুধু ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ পেয়েছে, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এবারও যেন শুধু কাগজের নকশায় চট্টগ্রামকে আটকে রাখা না হয়।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও চসিকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক রুদ্ধদ্বার বিশেষ সমন্বয় সভায় খসড়া মহাপরিকল্পনাটি পর্যালোচনাকালে এসব বিস্ফোরক মন্তব্য করেন চসিক মেয়র। একই সঙ্গে তিনি টেকসই ও পরিকল্পিত নগরায়ণের স্বার্থে বন্দরনগরীতে অবিলম্বে একটি একক প্রশাসনিক ও কার্যকর ‘নগর সরকার’ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন।

 

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সিডিএর নতুন মাস্টারপ্ল্যানে নগরের সীমানা প্রায় ৮ গুণ বাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী ৫টি উপজেলাকে মেট্রোপলিটনের আওতাভুক্ত করার যে জাঁকজমকপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন নগরপিতা। মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন প্রশ্ন তোলেন, “নগরের মূল ৪১টি ওয়ার্ডের জলাবদ্ধতা, যানজট, মশক নিধন ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক সংকটগুলো যেখানে এখনো অমীমাংসিত, সেখানে নতুন করে বিশাল এলাকার কাল্পনিক নকশা কার স্বার্থে? পরিকল্পনা হতে হবে মাঠের ক্ষত ও মানুষের ভোগান্তি বিবেচনায় নিয়ে, কোনো দাতা সংস্থার এসি রুমে বসে নয়।

 

সমন্বয় সভায় মেয়র তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও নাগরিক দর্শনের অন্যতম প্রধান দাবি ‘নগর সরকার’ প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “চট্টগ্রামের উন্নয়ন এখন সিডিএ, চসিক, ওয়াসা, পিডিবি বা বন্দর কর্তৃপক্ষের রশি টানাটানির প্রতিযোগিতায় জিম্মি হয়ে পড়েছে। একটি গাড়ির যেমন একাধিক চালক থাকতে পারে না, তেমনি একটি শহরের আমূল পরিবর্তনের জন্য সব সংস্থাকে একটি একক ‘ছাতা’ বা নগর সরকারের অধীনে আসতেই হবে।” মাস্টারপ্ল্যানে কোন সংস্থা কখন এবং কীভাবে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে, তা এখনই আইনি কাঠামোতে স্পষ্ট করার দাবি জানান তিনি।

 

সিডিএর খসড়া পরিকল্পনায় উত্তর চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা ও কর্ণফুলীর অববাহিকাকে দৃশ্যত সুরক্ষিত দেখানোর প্রস্তাব করা হলেও বাস্তবে পাহাড় কাটা ও নদী দখলের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর রূপরেখা না থাকায় উষ্মা প্রকাশ করেন মেয়র। তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেন, “ফ্লাইওভার আর বহুতল ভবনের নিচে যদি চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক খাল, নালা এবং পাহাড় হারিয়ে যায়, তবে ২০৫০ সালের মহাপরিকল্পনা কেবল একটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হবে।” মেয়রের এই অনড় অবস্থানের মুখে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন আশ্বস্ত করেন যে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এই মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত করার আগে মেয়রের উত্থাপিত সব পর্যবেক্ষণ এবং সর্বস্তরের নাগরিকদের মতামত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যুক্ত করা হবে।

 

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চট্টগ্রামের এই মাস্টারপ্ল্যান যেন কোনো কর্পোরেট প্রজেক্ট না হয়ে খাঁটি ‘জনবান্ধব দলিল’ হয়—মেয়রের এমন দৃঢ় অবস্থানকে চট্টগ্রামের সুশীল সমাজ ও নগর পরিকল্পনাবিদরাও স্বাগত জানিয়েছেন।

৫০০ কোটি টাকার ঐতিহাসিক স্টার্টআপ তহবিল ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

সিডিএর মাস্টারপ্ল্যানে শুভঙ্করের ফাঁকি চান না মেয়র, জোর ‘নগর সরকারে’

আপডেট সময় : ০৬:৩৩:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাঁকজমকপূর্ণ খসড়া নয়, মাঠের বাস্তবতায় মহাপরিকল্পনা সাজানোর কঠোর আলটিমেটাম চসিকের

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রস্তাবিত ২০২৫-২০৫০ মেয়াদের নতুন খসড়া মহাপরিকল্পনা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে একে আমূল পরিবর্তনের তাগিদ দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অতীতে একের পর এক মাস্টারপ্ল্যান করা হলেও সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা ও বাস্তববিমুখতার কারণে নগরবাসী শুধু ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ পেয়েছে, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এবারও যেন শুধু কাগজের নকশায় চট্টগ্রামকে আটকে রাখা না হয়।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও চসিকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক রুদ্ধদ্বার বিশেষ সমন্বয় সভায় খসড়া মহাপরিকল্পনাটি পর্যালোচনাকালে এসব বিস্ফোরক মন্তব্য করেন চসিক মেয়র। একই সঙ্গে তিনি টেকসই ও পরিকল্পিত নগরায়ণের স্বার্থে বন্দরনগরীতে অবিলম্বে একটি একক প্রশাসনিক ও কার্যকর ‘নগর সরকার’ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন।

 

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সিডিএর নতুন মাস্টারপ্ল্যানে নগরের সীমানা প্রায় ৮ গুণ বাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী ৫টি উপজেলাকে মেট্রোপলিটনের আওতাভুক্ত করার যে জাঁকজমকপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন নগরপিতা। মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন প্রশ্ন তোলেন, “নগরের মূল ৪১টি ওয়ার্ডের জলাবদ্ধতা, যানজট, মশক নিধন ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক সংকটগুলো যেখানে এখনো অমীমাংসিত, সেখানে নতুন করে বিশাল এলাকার কাল্পনিক নকশা কার স্বার্থে? পরিকল্পনা হতে হবে মাঠের ক্ষত ও মানুষের ভোগান্তি বিবেচনায় নিয়ে, কোনো দাতা সংস্থার এসি রুমে বসে নয়।

 

সমন্বয় সভায় মেয়র তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও নাগরিক দর্শনের অন্যতম প্রধান দাবি ‘নগর সরকার’ প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “চট্টগ্রামের উন্নয়ন এখন সিডিএ, চসিক, ওয়াসা, পিডিবি বা বন্দর কর্তৃপক্ষের রশি টানাটানির প্রতিযোগিতায় জিম্মি হয়ে পড়েছে। একটি গাড়ির যেমন একাধিক চালক থাকতে পারে না, তেমনি একটি শহরের আমূল পরিবর্তনের জন্য সব সংস্থাকে একটি একক ‘ছাতা’ বা নগর সরকারের অধীনে আসতেই হবে।” মাস্টারপ্ল্যানে কোন সংস্থা কখন এবং কীভাবে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে, তা এখনই আইনি কাঠামোতে স্পষ্ট করার দাবি জানান তিনি।

 

সিডিএর খসড়া পরিকল্পনায় উত্তর চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা ও কর্ণফুলীর অববাহিকাকে দৃশ্যত সুরক্ষিত দেখানোর প্রস্তাব করা হলেও বাস্তবে পাহাড় কাটা ও নদী দখলের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর রূপরেখা না থাকায় উষ্মা প্রকাশ করেন মেয়র। তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেন, “ফ্লাইওভার আর বহুতল ভবনের নিচে যদি চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক খাল, নালা এবং পাহাড় হারিয়ে যায়, তবে ২০৫০ সালের মহাপরিকল্পনা কেবল একটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হবে।” মেয়রের এই অনড় অবস্থানের মুখে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন আশ্বস্ত করেন যে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এই মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত করার আগে মেয়রের উত্থাপিত সব পর্যবেক্ষণ এবং সর্বস্তরের নাগরিকদের মতামত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যুক্ত করা হবে।

 

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চট্টগ্রামের এই মাস্টারপ্ল্যান যেন কোনো কর্পোরেট প্রজেক্ট না হয়ে খাঁটি ‘জনবান্ধব দলিল’ হয়—মেয়রের এমন দৃঢ় অবস্থানকে চট্টগ্রামের সুশীল সমাজ ও নগর পরিকল্পনাবিদরাও স্বাগত জানিয়েছেন।