সরকারের অনড় প্রশাসনের সাহসী পদক্ষেপে ভাসছে প্রশংসা
বিশেষ প্রতিবেদক
মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর মানেই এতকাল চোখের সামনে ভেসে উঠত এক চিলতে ফুটপাতের জন্য পথচারীদের অবিরাম যুদ্ধ, হকারদের গগনবিদারী চিৎকার, আর তীব্র যানজটে দমবন্ধ হওয়া এক নরকযন্ত্রণা। তবে বর্তমান বিএনপি সরকারের অধীনে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) আপসহীন ও কঠোর উচ্ছেদ অভিযানের পর চিরকালের জটলা পাকানো এই এলাকাটি এখন চেনা দায়। নেই কোনো কৃত্রিম জ্যাম, নেই হকারদের উপচে পড়া ভিড়, পুরো রাস্তা ও ফুটপাত এখন একদম মুক্ত। প্রায় দুই দশক পর মিরপুরের বুকে এমন অভূতপূর্ব শৃঙ্খলা দেখে সাধারণ মানুষ এখন সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও ডিএনসিসি প্রশাসনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
উচ্ছেদ করেই ক্ষান্ত হয়নি ডিএনসিসি। ফুটপাত পথচারীদের ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নগরের সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষায় সেখানে শুরু হয়েছে বিশেষ সবুজায়ন উদ্যোগ। ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের নির্দেশনায় হকারমুক্ত হওয়া ফুটপাতগুলোতে সারিবদ্ধভাবে গাছ লাগানো হচ্ছে। একই সাথে মেট্রোরেলের পিলারগুলো থেকে পুরোনো অবৈধ পোস্টার ও লিফলেট সরিয়ে সেখানে আঁকা হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন দেয়ালচিত্র।
উচ্ছেদ-পরবর্তী পরিস্থিতি ও উন্নয়নকাজ সশরীরে তদারকি করতে গভীর রাতে নিজে গাড়ি চালিয়ে মিরপুর-১০ এলাকা পরিদর্শন করেছেন ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। উচ্ছেদ করা জায়গায় হকাররা যেন আবার বসতে না পারে, সেজন্য তিনি হকারদের ফেলে যাওয়া অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগগুলো বিচ্ছিন্ন করার এবং সার্বক্ষণিক কড়া নজরদারির নির্দেশ দিয়েছেন।
গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, “কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও অপরাধী হকার সেজে ফুটপাত দখল করে সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল। জনগণের হাঁটার পথ কোনোভাবেই আর অবরুদ্ধ করতে দেওয়া হবে না। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই সমস্যা মোকাবিলায় আমাদের এই চিরুনি অভিযান ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা পর্যায়ক্রমে পুরো ঢাকা জুড়েই চলবে। এরপরও যদি কেউ নতুন করে কোনো ষড়যন্ত্র বা ফুটপাত পুনর্দখলের চেষ্টা করে, তবে নগরবাসীকে সাথে নিয়ে তা শক্ত হাতে প্রতিহত করা হবে।”
মিরপুর-১০ এর এই জাদুকরী পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি ফিরেছে সাধারণ পথচারী, নারী ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মনে। কোনো রকম ধাক্কাধাক্কি ছাড়াই এখন নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারছেন তারা।
১০ নম্বর চত্বরে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকুরিজীবী কামরুল হাসানের সাথে। উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেন, মিরপুরে গত ১৫ বছরে এমন পরিচ্ছন্ন ও ফাঁকা পরিবেশ দেখতে পাব, তা কখনো কল্পনাও করিনি। আগে অফিস থেকে ফেরার সময় ১০ নম্বরে নামলেই মাথা ধরে যেত। আর আজ কোনো জ্যাম নেই, জটলা নেই। ফুটপাতে সুন্দর গাছ লাগানো হচ্ছে। বর্তমান বিএনপি সরকারের এমন সাহসী ও অনড় সিদ্ধান্তের জন্য প্রশাসনকে মন থেকে ধন্যবাদ জানাই।
মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সুরাইয়া বেগম বলেন, আগে মেয়েকে নিয়ে এই ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। বাধ্য হয়ে রাস্তার ওপর দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাঁটতে হতো। এখন ফুটপাত একদম ফাঁকা, দেয়ালে সুন্দর গ্রাফিতি আঁকা হচ্ছে। সরকার যদি এই কঠোর নজরদারিটা সবসময় ধরে রাখতে পারে, তবেই এই পরিচ্ছন্নতার আসল সুফল আমরা পাব।
মিরপুরের এই নতুন সুশৃঙ্খল রূপ সহজে আসেনি। গত ৩০ সেপ্টেম্বর হোপ মার্কেট এলাকায় এই উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। পুনর্বাসনের দাবিতে এবং উচ্ছেদের বিরুদ্ধে হকার ও তাদের পেছনে থাকা অদৃশ্য সিন্ডিকেট এক হয়ে পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশনের ওপর লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে হামলা চালায়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে উগ্র হকাররা সিটি কর্পোরেশনের তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন দেয় এবং একটি এক্সকাভেটর ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে। এতে বেশ কয়েকজন পুলিশ ও সাংবাদিক আহত হন।
হকারদের সেই তীব্র সহিংসতা, হামলা ও উসকানি সত্ত্বেও বিএনপি সরকার ও ডিএনসিসি প্রশাসন তাদের সিদ্ধান্তে একচুলও নড়েনি। উল্টো ঘটনার পরপরই কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে পুরো এলাকা হকারমুক্ত করা হয়। হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
অতীতে বহুবার ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে উচ্ছেদ অভিযান হলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও চাঁদাবাজির কারণে কয়েকদিনের মধ্যেই ফুটপাত আবার আগের রূপ ধারণ করত। তবে এবার সাধারণ মানুষ আশা করছেন, বর্তমান সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কারণে প্রশাসন এই অর্জন ধরে রাখতে পারবে। সড়ক ও ফুটপাতজুড়ে সবুজের ছোঁয়া ও শৃঙ্খলার এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ যেন শুধু মিরপুরেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং পুরো তিলোত্তমা ঢাকা শহরে ছড়িয়ে পড়ে—এমনটাই এখন দেশের সচেতন নাগরিকদের মূল প্রত্যাশা।













