ঢাকা ০৬:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৪ দশকে বিলীন ৬০ শতাংশ পাহাড়: ক্ষতবিক্ষত চট্টগ্রাম, নেপথ্যে  অদৃশ্য সিন্ডিকেট

  • আপডেট সময় : ০৮:১৮:০৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
  • 16

নিজস্ব প্রতিবেদক :


‎প্রকৃতির আপন খেয়ালে গড়া পাহাড়, নদী আর সমুদ্রের মেলবন্ধনের এক অনন্য ক্যানভাস ছিল চট্টগ্রাম। কিন্তু বিগত চার দশকে এক শ্রেণির অতি-লোভী চক্রের আগ্রাসনে চট্টগ্রামের এই প্রাকৃতিক ভারসাম্য এখন খাদের কিনারায়। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ধারাবাহিক গবেষণায় উঠে এসেছে এক পিলে চমকানো তথ্য—গত ৪০ বছরে চট্টগ্রাম মহানগর ও এর আশপাশের অঞ্চলের প্রায় ৬০ শতাংশ পাহাড় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। একসময় যে পাহাড়গুলো ছিল এই শহরের ফুসফুস এবং জলাবদ্ধতার বিরুদ্ধে প্রধান ঢাল, আজ তা শুধুই ধূসর কংক্রিটের বাণিজ্যিক প্লট।

‎সরকারি নথি ও স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৯৭৬ সালেও চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রধান থানা এলাকাগুলোতে পাহাড়ের মোট আয়তন ছিল ৩২ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার। বর্তমান বাস্তবতায় তা সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৪ দশমিক ০২ বর্গকিলোমিটারে। অর্থাৎ, গত চার দশকে প্রায় ১৮ দশমিক ৩৪ বর্গকিলোমিটার পাহাড় কেটে সমতল ভূমিতে রূপান্তর করা হয়েছে।

‎পরিসংখ্যান বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১২০টি ঐতিহাসিক পাহাড় পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন বা সমতল করা হয়েছে। বাকি যে ৮০টি পাহাড় আংশিক টিকে আছে, সেগুলোর বুকও ক্ষতবিক্ষত। বায়েজিদ, লিংক রোড, আকবরশাহ, খুলশী, লালখান বাজার ও ফয়’স লেক এলাকায় পাহাড় কাটার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। এমনকি একটি সংযোগ সড়ক তৈরি করতে গিয়েই সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে এই অঞ্চলের ১৫টি বড় পাহাড়ের বুক চিরে ফেলা হয়েছে। আর এই পাহাড় কাটার জেরে প্রাক-বর্ষা ও বর্ষাকালীন পাহাড়ধসে এ পর্যন্ত ৩০০-এর বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।

‎মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান এবং স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, পাহাড় কাটার এই বিশাল মহাযজ্ঞ কোনো একক ব্যক্তি বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মামলা ও আইনি জটিলতা এড়াতে এই সিন্ডিকেট অত্যন্ত চতুর ও সুসংগঠিতভাবে কাজ করে, যার রয়েছে প্রধান তিনটি স্তর।

‎প্রথম স্তরে রয়েছেন অদৃশ্য অর্থদাতারা। এরা মূলত প্রভাবশালী ভূমিদস্যু ও বেনামী আবাসন ব্যবসায়ী। এরা কখনো সরাসরি মাঠে নামেন না। কাগজপত্রে ভুয়া সমবায় সমিতি বা ছিন্নমূল সমবায় সমিতির নাম ব্যবহার করে পাহাড়ের সরকারি খাস জমি দখল করেন। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে স্থানীয় পেশীশক্তি বা বাহুবলীরা। মাঠে পাহাড় কাটার জন্য দৈনিক মজুরিতে শ্রমিক ও মাটি কাটার ভারী যন্ত্র (এক্সকাভেটর) সরবরাহ করে স্থানীয় কিছু মাস্তান চক্র। এরা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। রাতের আঁধারে পাহাড় কাটার সময় এরা অস্ত্রহাতে পাহারা দেয়, যাতে সাধারণ মানুষ বা গণমাধ্যমকর্মীরা ছবি বা ভিডিও তুলতে না পারে।

‎সিন্ডিকেটের তৃতীয় ও সবচেয়ে শক্তিশালী স্তরটি হলো তদারকি সংস্থার একাংশের নীরব ভূমিকা। পরিবেশ অধিদপ্তর, সিডিএ এবং স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তার পরোক্ষ শিথিলতা বা উদাসীনতা এই চক্রের বড় সাহস। সাধারণত বড় পাহাড়ধসে মানুষের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কোনো কার্যকর অভিযান চালানো হয় না। আর অভিযান হলেও মূল হোতারা সব সময় অধরা থেকে যায়।


‎পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে ও পাদদেশে বসবাসকারী হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষ মূলত এই সিন্ডিকেটের দাবার ঘুঁটি। বায়েজিদ ও মতিঝরনা এলাকার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায় এক চরম সত্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা বুকভরা আতঙ্ক নিয়ে বলেন, “শহরে আমাদের মতো গরিব মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। বড় বড় স্যারেরা পাহাড় কেটে সমতল করে আমাদের কাছে সস্তায় প্লট বা কাঁচা ঘর ভাড়া দেয়। আমরা জানি বর্ষায় মাটি ধসে মরে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। কিন্তু আমরা অসহায়। যারা পাহাড় কাটে, তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুললে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করা হবে অথবা রাতের আঁধারে আমাদের এই ঘর থেকে উচ্ছেদ করে দেওয়া হবে।”


‎বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরাম এবং ফোরাম ফর প্ল্যান চট্টগ্রামের (এফপিসি) যৌথ গবেষণায় পাহাড় নিধনের সাথে চট্টগ্রামের স্থায়ী অভিশাপ “জলাবদ্ধতার” সরাসরি সংযোগ পাওয়া গেছে।

‎পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড় হলো চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক স্পঞ্জ, যা বৃষ্টির পানি শোষণ করে মাটির নিচে ধরে রাখে। পাহাড় কাটার ফলে মাটির ধারণক্ষমতা শূন্য হয়ে গেছে। ফলে সামান্য আধা ঘণ্টার বৃষ্টিতেই আলগা মাটি ধুয়ে এসে মহানগরের চাক্তাই, হিজড়া ও মির্জা খালগুলো সম্পূর্ণ ভরাট করে ফেলছে। এই কারণেই চট্টগ্রাম শহর এখন বর্ষায় স্থায়ী জোয়ারের পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে।

‎নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, চট্টগ্রাম এখন এক প্রাকৃতিক চোরাবালিতে পরিণত হয়েছে। পরিবেশ আইন অনুযায়ী পাহাড় কাটা জামিন অযোগ্য অপরাধ হলেও, আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে তীব্র বৈষম্য রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর বা প্রশাসন যে মামলাগুলো করে, তা সাধারণত ট্রাকচালক বা দিনমজুরদের নামে হয়। মূল অর্থদাতা বা পর্দার আড়ালের সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় না আনলে চট্টগ্রামের অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ পাহাড়ও আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে।


‎এই বিপর্যয় থেকে চট্টগ্রামকে বাঁচাতে বিশেষজ্ঞরা চার দফা সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছেন। প্রথমত, চট্টগ্রামের অবশিষ্ট পাহাড়গুলোর জন্য ‘রিস্ক-সেনসিটিভ ল্যান্ড ইউজ প্ল্যানিং’ ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করে সেখানে সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণ আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিদিনের পাহাড়ের ভৌগোলিক পরিবর্তন ট্র্যাক করতে ড্রোন প্রযুক্তি এবং সার্বক্ষণিক স্যাটেলাইট ম্যাপিং ব্যবহার করতে হবে। তৃতীয়ত, যে বা যারা পাহাড় কাটার পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করবে, তাদের চিহ্নিত করে প্রচলিত পরিবেশ আইনের পাশাপাশি তাদের সমস্ত বাণিজ্যিক লাইসেন্স বাতিল এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে হবে। এবং চতুর্থত, পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে শহরের বাইরে সমতল ও নিরাপদ সরকারি জমিতে স্থায়ীভাবে আবাসন নিশ্চিত করা।


‎চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি এই অঞ্চলের জলবায়ু, ইতিহাস ও সৌন্দর্যের মূল ভিত্তি। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হাত থেকে প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে লোকদেখানো জরিমানা বা চুনোপুঁটিদের নামে মামলা করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। প্রশাসনকে “শূন্য সহনশীলতা”  নীতি গ্রহণ করে পর্দার আড়ালের মূল নায়কদের আইনের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। অন্যথায়, অচিরেই পাহাড়হীন এক মৃত ও পরিত্যক্ত নগরীতে পরিণত হবে আমাদের ভালোবাসার চট্টগ্রাম।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শহীদ জিয়ার প্রথম মাজারে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির শ্রদ্ধা

৪ দশকে বিলীন ৬০ শতাংশ পাহাড়: ক্ষতবিক্ষত চট্টগ্রাম, নেপথ্যে  অদৃশ্য সিন্ডিকেট

আপডেট সময় : ০৮:১৮:০৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক :


‎প্রকৃতির আপন খেয়ালে গড়া পাহাড়, নদী আর সমুদ্রের মেলবন্ধনের এক অনন্য ক্যানভাস ছিল চট্টগ্রাম। কিন্তু বিগত চার দশকে এক শ্রেণির অতি-লোভী চক্রের আগ্রাসনে চট্টগ্রামের এই প্রাকৃতিক ভারসাম্য এখন খাদের কিনারায়। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ধারাবাহিক গবেষণায় উঠে এসেছে এক পিলে চমকানো তথ্য—গত ৪০ বছরে চট্টগ্রাম মহানগর ও এর আশপাশের অঞ্চলের প্রায় ৬০ শতাংশ পাহাড় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। একসময় যে পাহাড়গুলো ছিল এই শহরের ফুসফুস এবং জলাবদ্ধতার বিরুদ্ধে প্রধান ঢাল, আজ তা শুধুই ধূসর কংক্রিটের বাণিজ্যিক প্লট।

‎সরকারি নথি ও স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৯৭৬ সালেও চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রধান থানা এলাকাগুলোতে পাহাড়ের মোট আয়তন ছিল ৩২ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার। বর্তমান বাস্তবতায় তা সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৪ দশমিক ০২ বর্গকিলোমিটারে। অর্থাৎ, গত চার দশকে প্রায় ১৮ দশমিক ৩৪ বর্গকিলোমিটার পাহাড় কেটে সমতল ভূমিতে রূপান্তর করা হয়েছে।

‎পরিসংখ্যান বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১২০টি ঐতিহাসিক পাহাড় পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন বা সমতল করা হয়েছে। বাকি যে ৮০টি পাহাড় আংশিক টিকে আছে, সেগুলোর বুকও ক্ষতবিক্ষত। বায়েজিদ, লিংক রোড, আকবরশাহ, খুলশী, লালখান বাজার ও ফয়’স লেক এলাকায় পাহাড় কাটার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। এমনকি একটি সংযোগ সড়ক তৈরি করতে গিয়েই সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে এই অঞ্চলের ১৫টি বড় পাহাড়ের বুক চিরে ফেলা হয়েছে। আর এই পাহাড় কাটার জেরে প্রাক-বর্ষা ও বর্ষাকালীন পাহাড়ধসে এ পর্যন্ত ৩০০-এর বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।

‎মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান এবং স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, পাহাড় কাটার এই বিশাল মহাযজ্ঞ কোনো একক ব্যক্তি বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মামলা ও আইনি জটিলতা এড়াতে এই সিন্ডিকেট অত্যন্ত চতুর ও সুসংগঠিতভাবে কাজ করে, যার রয়েছে প্রধান তিনটি স্তর।

‎প্রথম স্তরে রয়েছেন অদৃশ্য অর্থদাতারা। এরা মূলত প্রভাবশালী ভূমিদস্যু ও বেনামী আবাসন ব্যবসায়ী। এরা কখনো সরাসরি মাঠে নামেন না। কাগজপত্রে ভুয়া সমবায় সমিতি বা ছিন্নমূল সমবায় সমিতির নাম ব্যবহার করে পাহাড়ের সরকারি খাস জমি দখল করেন। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে স্থানীয় পেশীশক্তি বা বাহুবলীরা। মাঠে পাহাড় কাটার জন্য দৈনিক মজুরিতে শ্রমিক ও মাটি কাটার ভারী যন্ত্র (এক্সকাভেটর) সরবরাহ করে স্থানীয় কিছু মাস্তান চক্র। এরা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। রাতের আঁধারে পাহাড় কাটার সময় এরা অস্ত্রহাতে পাহারা দেয়, যাতে সাধারণ মানুষ বা গণমাধ্যমকর্মীরা ছবি বা ভিডিও তুলতে না পারে।

‎সিন্ডিকেটের তৃতীয় ও সবচেয়ে শক্তিশালী স্তরটি হলো তদারকি সংস্থার একাংশের নীরব ভূমিকা। পরিবেশ অধিদপ্তর, সিডিএ এবং স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তার পরোক্ষ শিথিলতা বা উদাসীনতা এই চক্রের বড় সাহস। সাধারণত বড় পাহাড়ধসে মানুষের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কোনো কার্যকর অভিযান চালানো হয় না। আর অভিযান হলেও মূল হোতারা সব সময় অধরা থেকে যায়।


‎পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে ও পাদদেশে বসবাসকারী হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষ মূলত এই সিন্ডিকেটের দাবার ঘুঁটি। বায়েজিদ ও মতিঝরনা এলাকার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায় এক চরম সত্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা বুকভরা আতঙ্ক নিয়ে বলেন, “শহরে আমাদের মতো গরিব মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। বড় বড় স্যারেরা পাহাড় কেটে সমতল করে আমাদের কাছে সস্তায় প্লট বা কাঁচা ঘর ভাড়া দেয়। আমরা জানি বর্ষায় মাটি ধসে মরে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। কিন্তু আমরা অসহায়। যারা পাহাড় কাটে, তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুললে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করা হবে অথবা রাতের আঁধারে আমাদের এই ঘর থেকে উচ্ছেদ করে দেওয়া হবে।”


‎বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরাম এবং ফোরাম ফর প্ল্যান চট্টগ্রামের (এফপিসি) যৌথ গবেষণায় পাহাড় নিধনের সাথে চট্টগ্রামের স্থায়ী অভিশাপ “জলাবদ্ধতার” সরাসরি সংযোগ পাওয়া গেছে।

‎পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড় হলো চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক স্পঞ্জ, যা বৃষ্টির পানি শোষণ করে মাটির নিচে ধরে রাখে। পাহাড় কাটার ফলে মাটির ধারণক্ষমতা শূন্য হয়ে গেছে। ফলে সামান্য আধা ঘণ্টার বৃষ্টিতেই আলগা মাটি ধুয়ে এসে মহানগরের চাক্তাই, হিজড়া ও মির্জা খালগুলো সম্পূর্ণ ভরাট করে ফেলছে। এই কারণেই চট্টগ্রাম শহর এখন বর্ষায় স্থায়ী জোয়ারের পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে।

‎নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, চট্টগ্রাম এখন এক প্রাকৃতিক চোরাবালিতে পরিণত হয়েছে। পরিবেশ আইন অনুযায়ী পাহাড় কাটা জামিন অযোগ্য অপরাধ হলেও, আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে তীব্র বৈষম্য রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর বা প্রশাসন যে মামলাগুলো করে, তা সাধারণত ট্রাকচালক বা দিনমজুরদের নামে হয়। মূল অর্থদাতা বা পর্দার আড়ালের সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় না আনলে চট্টগ্রামের অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ পাহাড়ও আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে।


‎এই বিপর্যয় থেকে চট্টগ্রামকে বাঁচাতে বিশেষজ্ঞরা চার দফা সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছেন। প্রথমত, চট্টগ্রামের অবশিষ্ট পাহাড়গুলোর জন্য ‘রিস্ক-সেনসিটিভ ল্যান্ড ইউজ প্ল্যানিং’ ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করে সেখানে সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণ আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিদিনের পাহাড়ের ভৌগোলিক পরিবর্তন ট্র্যাক করতে ড্রোন প্রযুক্তি এবং সার্বক্ষণিক স্যাটেলাইট ম্যাপিং ব্যবহার করতে হবে। তৃতীয়ত, যে বা যারা পাহাড় কাটার পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করবে, তাদের চিহ্নিত করে প্রচলিত পরিবেশ আইনের পাশাপাশি তাদের সমস্ত বাণিজ্যিক লাইসেন্স বাতিল এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে হবে। এবং চতুর্থত, পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে শহরের বাইরে সমতল ও নিরাপদ সরকারি জমিতে স্থায়ীভাবে আবাসন নিশ্চিত করা।


‎চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি এই অঞ্চলের জলবায়ু, ইতিহাস ও সৌন্দর্যের মূল ভিত্তি। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হাত থেকে প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে লোকদেখানো জরিমানা বা চুনোপুঁটিদের নামে মামলা করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। প্রশাসনকে “শূন্য সহনশীলতা”  নীতি গ্রহণ করে পর্দার আড়ালের মূল নায়কদের আইনের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। অন্যথায়, অচিরেই পাহাড়হীন এক মৃত ও পরিত্যক্ত নগরীতে পরিণত হবে আমাদের ভালোবাসার চট্টগ্রাম।