ঢাকা ১০:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পরমাণু যুগে বাংলাদেশ: রূপপুরের প্রথম ইউনিট শেষ, মহাকাব্যের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত

  • আপডেট সময় : ০৭:৩০:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 4

বিশেষ প্রতিবেদন:

পরমাণু শক্তির অভিজাত ক্লাবে বাংলাদেশের রাজকীয় প্রবেশ এখন আর স্বপ্ন নয়, এক দৃশ্যমান বাস্তবতা। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবার্গে অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল অব ইয়ুথ’-এর এক বিশেষ অধিবেশনে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন (রোসাটম)-এর যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক আন্দ্রে তিমোনভ এই ঐতিহাসিক মাইলফলককে বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল ‘প্রযুক্তিগত মহালম্ফন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

তিমোনভ জানান, বাংলাদেশি অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে রোসাটম চলতি বছর প্রথম ইউনিটের নির্মাণ শেষ করেছে এবং গ্রীষ্মকাল থেকেই এর কমিশনিং বা পরীক্ষামূলক চালনা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ এমন এক প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা অর্জন করেছে, যা অর্জন করতে বিশ্বের অন্য অনেক দেশের ৬০ থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত সময় লেগেছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গেম-চেঞ্জার হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, রূপপুরের একটি ইউনিট পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশের প্রতি বছর প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সাশ্রয় হতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যেখানে বছরে ১০ মিলিয়ন টন কয়লা বা ১৯০ মিলিয়ন গ্যালন জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হতো, সেখানে পারমাণবিক শক্তি সেই বিশাল ব্যয়ের বোঝা কমিয়ে আনবে।

:পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্যতম বড় সুবিধা হলো এর উৎপাদন ব্যয় কয়লা বা তেলের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে ঘন ঘন ওঠানামা করে না। দীর্ঘমেয়াদে (কমপক্ষে ৬০ বছর) প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ অত্যন্ত সাশ্রয়ী (আনুমানিক ৫ টাকার নিচে) এবং স্থিতিশীল থাকবে, যা দেশের শিল্পায়নকে অবিশ্বাস্য গতি দেব।

পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে এটি জিডিপিতে পরোক্ষ ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় রূপপুর প্রকল্প চালু হলে বার্ষিক প্রায় ২০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন হ্রাস পাবে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক তহবিলের সুবিধা পেতে বাংলাদেশকে সাহায্য করবে। পিক-কনস্ট্রাকশন সময়ে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক এখানে কাজ করেছেন এবং বর্তমানে প্রায় ২,৫০০ জন স্থায়ীভাবে উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন, যা পাবনার ঈশ্বরদী অঞ্চলের স্থানীয় অর্থনীতিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের অবমূল্যায়নের কারণে প্রকল্পের ব্যয় কিছুটা সমন্বয় করতে হলেও (বর্তমান প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ১.৩৯ ট্রিলিয়ন টাকা), দীর্ঘমেয়াদি সুফলের কাছে এই প্রাথমিক বিনিয়োগ অত্যন্ত লাভজনক।

একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন ও সস্তা বিদ্যুতের কোনো বিকল্প নেই। রূপপুর প্রকল্প দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে, যা বিশেষ করে উত্তরের জনপদে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনবে। তবে এর সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে হলে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের আধুনিকায়ন ও স্থায়িত্ব দ্রুত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কয়েক দশকের পুরোনো যে স্বপ্নের বীজ বপন করা হয়েছিল সোভিয়েত আমলে ব্রেজনেভের কাছে আবেদনের মাধ্যমে, আজ তা রূপপুরের পদ্মাপাড়ে এক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বিপ্লবের রূপ নিয়েছে। এই ঐতিহাসিক মাইলফলকের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জন করল।

জনপ্রিয় সংবাদ

ন্যাম ভবন থেকে এমপি গাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

পরমাণু যুগে বাংলাদেশ: রূপপুরের প্রথম ইউনিট শেষ, মহাকাব্যের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত

আপডেট সময় : ০৭:৩০:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশেষ প্রতিবেদন:

পরমাণু শক্তির অভিজাত ক্লাবে বাংলাদেশের রাজকীয় প্রবেশ এখন আর স্বপ্ন নয়, এক দৃশ্যমান বাস্তবতা। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবার্গে অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল অব ইয়ুথ’-এর এক বিশেষ অধিবেশনে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন (রোসাটম)-এর যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক আন্দ্রে তিমোনভ এই ঐতিহাসিক মাইলফলককে বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল ‘প্রযুক্তিগত মহালম্ফন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

তিমোনভ জানান, বাংলাদেশি অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে রোসাটম চলতি বছর প্রথম ইউনিটের নির্মাণ শেষ করেছে এবং গ্রীষ্মকাল থেকেই এর কমিশনিং বা পরীক্ষামূলক চালনা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ এমন এক প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা অর্জন করেছে, যা অর্জন করতে বিশ্বের অন্য অনেক দেশের ৬০ থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত সময় লেগেছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গেম-চেঞ্জার হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, রূপপুরের একটি ইউনিট পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশের প্রতি বছর প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সাশ্রয় হতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যেখানে বছরে ১০ মিলিয়ন টন কয়লা বা ১৯০ মিলিয়ন গ্যালন জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হতো, সেখানে পারমাণবিক শক্তি সেই বিশাল ব্যয়ের বোঝা কমিয়ে আনবে।

:পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্যতম বড় সুবিধা হলো এর উৎপাদন ব্যয় কয়লা বা তেলের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে ঘন ঘন ওঠানামা করে না। দীর্ঘমেয়াদে (কমপক্ষে ৬০ বছর) প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ অত্যন্ত সাশ্রয়ী (আনুমানিক ৫ টাকার নিচে) এবং স্থিতিশীল থাকবে, যা দেশের শিল্পায়নকে অবিশ্বাস্য গতি দেব।

পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে এটি জিডিপিতে পরোক্ষ ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় রূপপুর প্রকল্প চালু হলে বার্ষিক প্রায় ২০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন হ্রাস পাবে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক তহবিলের সুবিধা পেতে বাংলাদেশকে সাহায্য করবে। পিক-কনস্ট্রাকশন সময়ে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক এখানে কাজ করেছেন এবং বর্তমানে প্রায় ২,৫০০ জন স্থায়ীভাবে উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন, যা পাবনার ঈশ্বরদী অঞ্চলের স্থানীয় অর্থনীতিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের অবমূল্যায়নের কারণে প্রকল্পের ব্যয় কিছুটা সমন্বয় করতে হলেও (বর্তমান প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ১.৩৯ ট্রিলিয়ন টাকা), দীর্ঘমেয়াদি সুফলের কাছে এই প্রাথমিক বিনিয়োগ অত্যন্ত লাভজনক।

একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন ও সস্তা বিদ্যুতের কোনো বিকল্প নেই। রূপপুর প্রকল্প দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে, যা বিশেষ করে উত্তরের জনপদে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনবে। তবে এর সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে হলে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের আধুনিকায়ন ও স্থায়িত্ব দ্রুত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কয়েক দশকের পুরোনো যে স্বপ্নের বীজ বপন করা হয়েছিল সোভিয়েত আমলে ব্রেজনেভের কাছে আবেদনের মাধ্যমে, আজ তা রূপপুরের পদ্মাপাড়ে এক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বিপ্লবের রূপ নিয়েছে। এই ঐতিহাসিক মাইলফলকের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জন করল।