শাহজাদা সৈয়দ গোলাম মোরশেদ আল-হাসানী মাইজভাণ্ডারী
সুফিবাদ বা তরিকতের মূল ভিত্তি হলো ‘তাসাল্লিম’ বা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং ‘ইশক’ বা পরম প্রেম। সৃষ্টির সেবার মধ্য দিয়ে স্রষ্টার নৈকট্য লাভ এবং মুর্শিদের কদমে নিজের অহংকে বিলীন করে দেওয়ার নামই ফানা। তরিকতের এই গভীর দর্শন কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং এটি জীবন দিয়ে উপলব্ধি করার বিষয়। মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এমন বহু ক্ষণজন্মা সাধকের আগমন ঘটেছে, যাঁদের জীবন ছিল তরিকতের এই জীবন্ত দর্শন। তাঁদেরই একজন তরিকতের উজ্জ্বল নক্ষত্র—হযরত আব্দুল আজিম মাইজভাণ্ডারী (র.), যিনি দরবারে ‘আজিম ফকির’ নামেই সমধিক পরিচিত।
তিনি বাহ্যিকভাবে এবং শরীয়তের নিয়মানুযায়ী প্রথম দীক্ষা বা বায়াত গ্রহণ করেছিলেন ওহাব বাবাজানের কাছে। তবে আধ্যাত্মিক জগতের এক অমোঘ নিয়ম হলো—”বায়াত এক স্থানে, ফয়েজ অন্য স্থানে”।
ওহাব বাবাজানের হাত ধরে তরিকতে আসলেও, আব্দুল আজিম মাইজভাণ্ডারীর ভেতরের মারেফতের আলো, আধ্যাত্মিক জাগরণ এবং খেলাফতের যোগ্যতা অর্জিত হয়েছিল সরাসরি গাউছুল আজম হযরত শাহসূফী সৈয়দ গোলামুর রহমান প্রকাশ বাবা ভাণ্ডারী (ক.) এঁর বিশেষ নজর ও রুহানি ফয়েজের মাধ্যমে। ফলে তিনি দরবারে ‘খলিফায়ে গাউসুল আজম’ হিসেবে সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক মাকাম ও স্বীকৃতি লাভ করেন।
গাউছিয়া বাবে সোবহান মনজিলের ঐতিহ্য ও আমার মুর্শিদ কেবলা ইউছুপ মাওলা বাবাজান-এর মুখ থেকে শোনা হযরত আব্দুল আজিম মাইজভাণ্ডারী (র.)-এর জীবনের দুটি অমূল্য ঘটনা আজীবন ভক্তকুলের জন্য পরম শিক্ষার আলো হয়ে থাকবে।
একদিন ওহাব বাবাজান ময়মনসিংহ সফরে যাওয়ার সময় আজিম ফকিরকে দরবার শরীফের দায়িত্বে রেখে যান। সে সময় গাউসুল আজম বাবা ভাণ্ডারী কেবলা ক্বাবার বড় ভাই সাইয়্যেদেনা গোলাম সোবহান (ক.) [যিনি জেঠাজি বাবাজান নামে সুপরিচিত]-এর একমাত্র শাহজাদা সাইয়্যেদেনা আব্দুল মাবুদ বাবাজান-এর খেদমতের এক বিশেষ হুকুম হয়।
আজিম ফকির সন্ধ্যার মাগরিবের পর থেকে একনাগাড়ে হাতপাখা দিয়ে দাদাজান আব্দুল মাবুদ বাবাজানকে বাতাস করতে শুরু করেন। তরিকতের আদব এমনই কঠোর যে, মুর্শিদের হুকুমের সামনে নিজের শরীরের ক্লান্তি বা কষ্ট তুচ্ছ হয়ে যায়। রাত যখন ৯টা, তখন ওহাব বাবার অন্য এক আশেক ও খলিফা, পটিয়া নলান্দার সুরমা ফকির দরবারে ফিরে দেখেন আজিম ফকির টানা কয়েক ঘণ্টা বাতাস করতে করতে হাত ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। সুরমা ফকির দয়াপরশ হয়ে পাখাটি নিজের হাতে নিতে চাইলে আজিম ফকির দৃঢ়তার সাথে বলেন, “বাবাজান আমাকে হুকুম করেছেন বাতাস করতে। উনার হুকুম ছাড়া এই হাতপাখা কেউ নিতে পারবে না। হাত ফুলে যাক কিংবা ব্যথা হোক, হুকুম না হওয়া পর্যন্ত আমি থামব না এবং দানাপানিও মুখে দেব না।”
গোলামের এই অনন্য নিষ্ঠা ও আত্মসমর্পণ দেখে সাইয়্যেদেনা আব্দুল মাবুদ বাবাজান মুচকি হাসলেন। এরপর যখন রাতের আহারের সময় হলো, দেখা গেল তীব্র ব্যথার কারণে আজিম ফকির নিজের হাতে অন্ন তুলে খেতে পারছেন না, ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছে। তখন আব্দুল মাবুদ বাবাজান পরম মমতায় নিজ মোবারক হস্তে আজিম ফকিরকে সম্পূর্ণ খানা খাইয়ে দিলেন এবং তাঁর হাত বুলিয়ে দিলেন। অলৌকিকভাবে নিমিষেই সেই ব্যথা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। বাবাজান স্নেহের সুরে বললেন, “বাবা, আমাকে তো বলতে পারতে যে হাত ব্যথা করছে!” আজিম ফকিরের উত্তর ছিল সুফিবাদের মূল নির্যাস—”গোলামের কাজ মনিবের খেদমত করা। হুকুম না হওয়া পর্যন্ত প্রাণ চলে গেলেও কাজ থেকে বিরত না থাকাই গোলামী।” তিনি তাঁর যাপন দিয়ে উপস্থিত ভক্তদের বুঝিয়ে দিলেন—কেমন আত্মত্যাগ করলে ‘খেদমতে খালক’ (সৃষ্টির সেবা) ও ‘খেদমতে হক্ব’ (স্রষ্টার সেবা) অর্জন করা যায়।
হযরত আব্দুল আজিম মাইজভাণ্ডারী (র.)-এর আধ্যাত্মিক প্রেমের আরেকটি সুন্দর দিক ছিল দরবারের নূরানী আওলাদপাকদের প্রতি তাঁর নিখাদ ভালোবাসা। তিনি সবসময় নিজের পকেটে কিছু চকলেট বা মিষ্টি রাখতেন। দরবারের ছোট ছোট শাহজাদারা যখন খেলতে আসতেন, তখন আজিম ফকিরের কাছে চকলেটের বায়না ধরতেন। আজিম ফকির নিজের প্রয়োজনের কথা ভুলে, নিজের জমানো সব টাকা দিয়ে দোকানের সব চকলেট কিনে নিতেন এবং শিশুদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। নিজের জন্য একটি চকলেটও রাখতেন না।
কোনো এক ভক্ত কৌতুহলী হয়ে এর কারণ জানতে চাইলে আজিম ফকির অশ্রুসজল চোখে উত্তর দিয়েছিলেন, “রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নাতী ও নূরানী আওলাদদের আনন্দে রাখা, তাঁদের মুখে হাসি ফোটানোই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ইবাদত।”
দরবারের প্রতি এবং প্রিয় নবী (স.)-এর বংশধরদের প্রতি কী গভীর ইশক ও ফানা ফিল ফানা অবস্থা থাকলে একজন মানুষ নিজেকে এভাবে বিলিয়ে দিতে পারেন, তা ভাবলে আজও গা শিউরে ওঠে।
আজকের দিনে তরিকত বা সুফিবাদের নামে যখন বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার আতিশয্য দেখা যায়, তখন হযরত আব্দুল আজিম মাইজভাণ্ডারী (র.)-এর এই জীবনলিপি আমাদের এক গভীর আত্মোপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করায়। মুর্শিদের কদমে নিজেকে বিলীন করে দেওয়া, হুকুমের অবাধ্য না হওয়া এবং অহংকারমুক্ত হয়ে নিঃস্বার্থ সেবা করার এই আদর্শ আজ যেন সমাজ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। এই আদর্শ খেদমত আর নিঃশর্ত গোলামী এখন আর খুব একটা চোখে পড়ে না।
মাইজভাণ্ডারী তরিকতের মূল সুরই হলো প্রেম, সাম্য ও অকৃত্রিম সেবা। খলিফা আব্দুল আজিম মাইজভাণ্ডারী (র.)-এর জীবন থেকে পাওয়া এই শিক্ষা বর্তমান প্রজন্মের সুফি-অনুসন্ধিৎসু ও তরিকতপন্থীদের জন্য এক শাশ্বত গাইডলাইন বা দিকনির্দেশনা। নিজের আমিত্বকে বিসর্জন দিয়ে কীভাবে মনিবের কদমে ফানা হতে হয়, আজিম ফকিরের পবিত্র জীবনই তার শ্রেষ্ঠ স্মারক।
(লেখক: সাজ্জাদানশীন ও মোন্তাজেম, গাউছিয়া বাবে সোবহান মনজিল, মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ, চট্টগ্রাম।)

























