ঢাকা ১১:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খুলশীতে পাঁচ দেশের ৬৩ নাগরিকের ‘টর্চার সেল’: কোটি টাকার ক্যাসিনো সরঞ্জাম ও ১৭০ ডিভাইস জব্দ

  • আপডেট সময় : ০৭:৩৪:৩৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 28

নিজস্ব  প্রতিবেদক

 

চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানার জালালাবাদ কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার একটি ৯ তলা ভবন ঘিরে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলত অদ্ভুত সব কর্মকাণ্ড। বাইরে থেকে বোঝার উপায় ছিল না ভেতরে কী ঘটছে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কঠোর নিরাপত্তা, সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি আর সার্বক্ষণিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষগুলোতে চলত রহস্যময় সব তৎপরতা। অবশেষে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে পুলিশ ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (সিটিইউ) যৌথ অভিযানে বেরিয়ে এসেছে থলের বিড়াল।

অভিযান শেষে ওই ভবন থেকে ৫টি ভিন্ন দেশের মোট ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে লাওসের ৩৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের ৫ জন, নেপালের ১ জন এবং ভিয়েতনামের ১ জন নাগরিক রয়েছেন। আটককৃতদের মধ্যে ৪১ জন পুরুষ ও ২১ জন নারী। উদ্ধার করা হয়েছে ১৩১টি মোবাইল ও ৫৬টি ল্যাপটপসহ মোট ১৭০টি ইলেকট্রনিক ডিভাইস, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা এবং আন্তর্জাতিক মানের ক্যাসিনো গ্যাম্বলিং ও স্ক্যামিং সরঞ্জাম

ভেতরে আসলে কী হচ্ছিল? পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও আলামত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এটি কোনো সাধারণ আবাসন বা কার্যালয় ছিল না। বহুতল ভবনটির ৮ম তলা ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল একটি আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা (অনলাইন স্ক্যামিং) এবং অবৈধ জুয়া (অনলাইন ক্যাসিনো)-এর আস্তানা। আটককৃত বিদেশিরা মূলত ‘ভিসা অন অ্যারাইভাল’ নিয়ে প্রায় ৬ সপ্তাহ আগে বাংলাদেশে আসেন। এরপর এই চক্রটি বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের টার্গেট করে অনলাইন ক্রিপ্টোকারেন্সি, ভুয়া বিনিয়োগ ও লটারির লোভ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল।

ভবনটির ভেতরে ক্যাসিনো খেলার আধুনিক বোর্ড, চিপস এবং বিশেষায়িত ডিজিটাল সেটআপ পাওয়া গেছে। পুরো চক্রটি শিফট ও টার্গেট ভিত্তিক কাজ করত, যেখানে ইন্টারনেট প্রটোকল (IP) হাইড করে বিভিন্ন দেশের সার্ভার ব্যবহার করা হচ্ছিল।

প্রশাসনের বক্তব্য অভিযান ও সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রটির ওপর নজর রাখছিলেন।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (সিটিইউ) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান আমরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ভবনটি ঘেরাও করে এই অভিযান চালাই। প্রাথমিকভাবে এটি একটি আন্তর্জাতিক অনলাইন স্ক্যামিং এবং অবৈধ ক্যাসিনো চক্রের মূল কেন্দ্র বলে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া গেছে। আটক ব্যক্তিরা বাংলাদেশে ট্যুরিস্ট বা অন-অ্যারাইভাল ভিসা নিয়ে এসে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। জব্দকৃত ১৭০টি ডিজিটাল ডিভাইস আমরা ফরেনসিক ল্যাবে পাঠাচ্ছি। এর মাধ্যমে জানা যাবে তারা কোন কোন দেশের নাগরিকদের সাথে প্রতারণা করছিল এবং এই চক্রের দেশীয় কোনো সহযোগী আছে কি না।

 

খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গণমাধ্যমকে বলেনআটককৃত ৬৩ জন বিদেশি নাগরিক বর্তমানে আমাদের হেফাজতে আছেন। তাদের পাসপোর্টের বৈধতা এবং ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ক্যাসিনো পরিচালনা, ডিজিটাল প্রতারণা এবং ফরেনার্স অ্যাক্ট (বিদেশি নাগরিক আইন) লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ঘটনার নেপথ্যে থাকা মূল হোতাদের চিহ্নিত করতে আমরা কাজ করছি।

 

পুলিশের ধারণা, বাংলাদেশেক ‘নিরাপদ জোন’ হিসেবে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক এই চক্রটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল। উদ্ধারকৃত বিপুল পরিমাণ ক্যাসিনো সরঞ্জাম ও ডিভাইস নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে আরও বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। আটককৃতদের আজই আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ডের আবেদন জানানো হতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চোর সন্দেহে যুবককে খুঁটিতে বেঁধে, পিঠে ইট চাপিয়ে পিটিয়ে হত্যা

খুলশীতে পাঁচ দেশের ৬৩ নাগরিকের ‘টর্চার সেল’: কোটি টাকার ক্যাসিনো সরঞ্জাম ও ১৭০ ডিভাইস জব্দ

আপডেট সময় : ০৭:৩৪:৩৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিজস্ব  প্রতিবেদক

 

চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানার জালালাবাদ কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার একটি ৯ তলা ভবন ঘিরে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলত অদ্ভুত সব কর্মকাণ্ড। বাইরে থেকে বোঝার উপায় ছিল না ভেতরে কী ঘটছে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কঠোর নিরাপত্তা, সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি আর সার্বক্ষণিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষগুলোতে চলত রহস্যময় সব তৎপরতা। অবশেষে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে পুলিশ ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (সিটিইউ) যৌথ অভিযানে বেরিয়ে এসেছে থলের বিড়াল।

অভিযান শেষে ওই ভবন থেকে ৫টি ভিন্ন দেশের মোট ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে লাওসের ৩৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের ৫ জন, নেপালের ১ জন এবং ভিয়েতনামের ১ জন নাগরিক রয়েছেন। আটককৃতদের মধ্যে ৪১ জন পুরুষ ও ২১ জন নারী। উদ্ধার করা হয়েছে ১৩১টি মোবাইল ও ৫৬টি ল্যাপটপসহ মোট ১৭০টি ইলেকট্রনিক ডিভাইস, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা এবং আন্তর্জাতিক মানের ক্যাসিনো গ্যাম্বলিং ও স্ক্যামিং সরঞ্জাম

ভেতরে আসলে কী হচ্ছিল? পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও আলামত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এটি কোনো সাধারণ আবাসন বা কার্যালয় ছিল না। বহুতল ভবনটির ৮ম তলা ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল একটি আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা (অনলাইন স্ক্যামিং) এবং অবৈধ জুয়া (অনলাইন ক্যাসিনো)-এর আস্তানা। আটককৃত বিদেশিরা মূলত ‘ভিসা অন অ্যারাইভাল’ নিয়ে প্রায় ৬ সপ্তাহ আগে বাংলাদেশে আসেন। এরপর এই চক্রটি বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের টার্গেট করে অনলাইন ক্রিপ্টোকারেন্সি, ভুয়া বিনিয়োগ ও লটারির লোভ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল।

ভবনটির ভেতরে ক্যাসিনো খেলার আধুনিক বোর্ড, চিপস এবং বিশেষায়িত ডিজিটাল সেটআপ পাওয়া গেছে। পুরো চক্রটি শিফট ও টার্গেট ভিত্তিক কাজ করত, যেখানে ইন্টারনেট প্রটোকল (IP) হাইড করে বিভিন্ন দেশের সার্ভার ব্যবহার করা হচ্ছিল।

প্রশাসনের বক্তব্য অভিযান ও সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রটির ওপর নজর রাখছিলেন।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (সিটিইউ) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান আমরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ভবনটি ঘেরাও করে এই অভিযান চালাই। প্রাথমিকভাবে এটি একটি আন্তর্জাতিক অনলাইন স্ক্যামিং এবং অবৈধ ক্যাসিনো চক্রের মূল কেন্দ্র বলে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া গেছে। আটক ব্যক্তিরা বাংলাদেশে ট্যুরিস্ট বা অন-অ্যারাইভাল ভিসা নিয়ে এসে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। জব্দকৃত ১৭০টি ডিজিটাল ডিভাইস আমরা ফরেনসিক ল্যাবে পাঠাচ্ছি। এর মাধ্যমে জানা যাবে তারা কোন কোন দেশের নাগরিকদের সাথে প্রতারণা করছিল এবং এই চক্রের দেশীয় কোনো সহযোগী আছে কি না।

 

খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গণমাধ্যমকে বলেনআটককৃত ৬৩ জন বিদেশি নাগরিক বর্তমানে আমাদের হেফাজতে আছেন। তাদের পাসপোর্টের বৈধতা এবং ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ক্যাসিনো পরিচালনা, ডিজিটাল প্রতারণা এবং ফরেনার্স অ্যাক্ট (বিদেশি নাগরিক আইন) লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ঘটনার নেপথ্যে থাকা মূল হোতাদের চিহ্নিত করতে আমরা কাজ করছি।

 

পুলিশের ধারণা, বাংলাদেশেক ‘নিরাপদ জোন’ হিসেবে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক এই চক্রটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল। উদ্ধারকৃত বিপুল পরিমাণ ক্যাসিনো সরঞ্জাম ও ডিভাইস নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে আরও বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। আটককৃতদের আজই আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ডের আবেদন জানানো হতে পারে।