ঢাকা ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কংক্রিটের ভিড়ে ঐতিহ্য বাঁচানোর আকুতি: হারানো যৌবন কি ফিরে পাবে শতবর্ষী ‘কাজীর দিঘী’?

  • আপডেট সময় : ০১:২০:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 3

নিজস্ব প্রতিবেদক

‎চট্টগ্রাম নগরীর বুক চিরে ব্যাঙের ছাতার মতো উঠছে একের পর এক বহুতল ভবন। হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ সবুজ, সংকুচিত হচ্ছে জলাশয়। এই ইট-পাথরের মহোৎসবের মাঝেও শত বছরের ইতিহাস আর বুকভরা আবেগ নিয়ে কোনোমতে টিকে আছে এক বিশাল জলশায়—নাম তার ‘কাজীর দিঘী’। চট্টগ্রাম নগরীর অন্যতম ব্যস্ত দুই এলাকা, দক্ষিণ কাট্টলী আর সরাইপাড়ার সীমানায় অবস্থিত এই দিঘীটি কেবল একটি জলাশয় নয়; বরং এই অঞ্চলের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আজ অবধি, কাট্টলীবাসীর সুখ-দুঃখের হাজারো গল্প মিশে আছে এই দিঘীর টলটলে জলে।



‎ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, একসময় এই উপকূলীয় অঞ্চলে মিঠা পানির তীব্র সংকট ছিল। তখন স্থানীয় এক প্রভাবশালী ও সমাজসেবক কাজী পরিবারের উদ্যোগে খনন করা হয় এই বিশাল দিঘী। তৎকালীন গ্রামীণ মানুষের রান্নাবান্না, গোসল আর সুপেয় পানির প্রধান ভরসা হয়ে ওঠে এই দিঘীর পানি। সময়ের সাথে সাথে এই দিঘীকে কেন্দ্র করেই পাশে গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক ‘কাজীর দিঘী জামে মসজিদ’ এবং ‘লোহারপুল বাজার’। শত বছর ধরে এই অঞ্চলের অর্থনীতি আর সমাজব্যবস্থার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই ঐতিহাসিক দিঘী।


‎কালের বিবর্তনে চারপাশের শান্ত গ্রামীণ পরিবেশ আজ বিলুপ্ত। চারদিকে এখন শুধুই যান্ত্রিকতার কোলাহল। আধুনিকতার এই ঝড়ে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক দিঘীটি আজ কিছুটা সংকুচিত ও অবহেলিত। তবে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও দিঘীটিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রবীণদের কণ্ঠে আজও ঝরে পড়ে এই দিঘীর ঘাটে কাটানো শৈশব-কৈশোরের সোনালী স্মৃতি আর আবেগ।


‎স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সামান্য একটু সরকারি উদ্যোগ বদলে দিতে পারে পুরো দৃশ্যপট। কাট্টলী ও সরাইপাড়ার মানুষের জোর দাবি—ঐতিহাসিক এই দিঘীটিকে দ্রুত চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ কিংবা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) আওতায় নিয়ে আসা হোক। আধুনিক উপায়ে সংস্কার ও দূষণমুক্ত করে এখানে যদি পর্যটকদের জন্য বোট বা নৌ-ভ্রমণের ব্যবস্থা করা যায়, তবে এটি রূপ নিতে পারে চমৎকার এক বিনোদন কেন্দ্রে। চারপাশে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে, বসার স্থান আর সবুজায়নের ব্যবস্থা করলে, কংক্রিটের এই ঘিঞ্জি নগরীতে যুক্ত হবে ফুসফুসের মতো এক প্রাণবন্ত পর্যটন কেন্দ্র।


‎পরিবেশবিদরা বারবার বলছেন, ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে নয়, বরং ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেই গড়ে ওঠে আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী। এখন প্রশ্ন হলো—চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশন কি পারবে কাট্টলীবাসীর এই যৌক্তিক স্বপ্নের প্রতি সাড়া দিতে? কাজীর দিঘী কি ফিরে পাবে তার হারানো রূপ ও যৌবন, নাকি উদাসীনতার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে এই শতবর্ষী ইতিহাস? সেই উত্তরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন কাট্টলী ও সরাইপাড়ার হাজারো মানুষ।

জনপ্রিয় সংবাদ

শেখ হাসিনা ফিরলে পুলিশ অকার্যকর’: অডিও কেলেঙ্কারিতে ক্যান্টনমেন্টের ওসি প্রত্যাহার, হাতকড়া পরানোর দাবি

কংক্রিটের ভিড়ে ঐতিহ্য বাঁচানোর আকুতি: হারানো যৌবন কি ফিরে পাবে শতবর্ষী ‘কাজীর দিঘী’?

আপডেট সময় : ০১:২০:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

‎চট্টগ্রাম নগরীর বুক চিরে ব্যাঙের ছাতার মতো উঠছে একের পর এক বহুতল ভবন। হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ সবুজ, সংকুচিত হচ্ছে জলাশয়। এই ইট-পাথরের মহোৎসবের মাঝেও শত বছরের ইতিহাস আর বুকভরা আবেগ নিয়ে কোনোমতে টিকে আছে এক বিশাল জলশায়—নাম তার ‘কাজীর দিঘী’। চট্টগ্রাম নগরীর অন্যতম ব্যস্ত দুই এলাকা, দক্ষিণ কাট্টলী আর সরাইপাড়ার সীমানায় অবস্থিত এই দিঘীটি কেবল একটি জলাশয় নয়; বরং এই অঞ্চলের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আজ অবধি, কাট্টলীবাসীর সুখ-দুঃখের হাজারো গল্প মিশে আছে এই দিঘীর টলটলে জলে।



‎ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, একসময় এই উপকূলীয় অঞ্চলে মিঠা পানির তীব্র সংকট ছিল। তখন স্থানীয় এক প্রভাবশালী ও সমাজসেবক কাজী পরিবারের উদ্যোগে খনন করা হয় এই বিশাল দিঘী। তৎকালীন গ্রামীণ মানুষের রান্নাবান্না, গোসল আর সুপেয় পানির প্রধান ভরসা হয়ে ওঠে এই দিঘীর পানি। সময়ের সাথে সাথে এই দিঘীকে কেন্দ্র করেই পাশে গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক ‘কাজীর দিঘী জামে মসজিদ’ এবং ‘লোহারপুল বাজার’। শত বছর ধরে এই অঞ্চলের অর্থনীতি আর সমাজব্যবস্থার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই ঐতিহাসিক দিঘী।


‎কালের বিবর্তনে চারপাশের শান্ত গ্রামীণ পরিবেশ আজ বিলুপ্ত। চারদিকে এখন শুধুই যান্ত্রিকতার কোলাহল। আধুনিকতার এই ঝড়ে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক দিঘীটি আজ কিছুটা সংকুচিত ও অবহেলিত। তবে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও দিঘীটিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রবীণদের কণ্ঠে আজও ঝরে পড়ে এই দিঘীর ঘাটে কাটানো শৈশব-কৈশোরের সোনালী স্মৃতি আর আবেগ।


‎স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সামান্য একটু সরকারি উদ্যোগ বদলে দিতে পারে পুরো দৃশ্যপট। কাট্টলী ও সরাইপাড়ার মানুষের জোর দাবি—ঐতিহাসিক এই দিঘীটিকে দ্রুত চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ কিংবা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) আওতায় নিয়ে আসা হোক। আধুনিক উপায়ে সংস্কার ও দূষণমুক্ত করে এখানে যদি পর্যটকদের জন্য বোট বা নৌ-ভ্রমণের ব্যবস্থা করা যায়, তবে এটি রূপ নিতে পারে চমৎকার এক বিনোদন কেন্দ্রে। চারপাশে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে, বসার স্থান আর সবুজায়নের ব্যবস্থা করলে, কংক্রিটের এই ঘিঞ্জি নগরীতে যুক্ত হবে ফুসফুসের মতো এক প্রাণবন্ত পর্যটন কেন্দ্র।


‎পরিবেশবিদরা বারবার বলছেন, ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে নয়, বরং ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেই গড়ে ওঠে আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী। এখন প্রশ্ন হলো—চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশন কি পারবে কাট্টলীবাসীর এই যৌক্তিক স্বপ্নের প্রতি সাড়া দিতে? কাজীর দিঘী কি ফিরে পাবে তার হারানো রূপ ও যৌবন, নাকি উদাসীনতার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে এই শতবর্ষী ইতিহাস? সেই উত্তরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন কাট্টলী ও সরাইপাড়ার হাজারো মানুষ।