ঢাকা ১২:৩১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্যস্ত নগরে প্রশান্তি: প্রতিদিনের জীবনে যেভাবে ফেরাবেন মানসিক ভারসাম্য

  • আপডেট সময় : ০৫:২৬:২৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 16

রাসেল চৌধুরী

সকাল হলেই অ্যালার্মের কর্কশ শব্দ, তাড়াহুড়ো করে তৈরি হওয়া, ট্রাফিক জ্যামের ধকল আর অফিসে কাজের পাহাড়—একটি সাধারণ শহরের মানুষের ২৪ ঘণ্টার চেনা ছবি এটি। প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর প্রতিযোগিতার এই যুগে আমাদের জীবনযাত্রা যেমন গতিশীল হয়েছে, ঠিক তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানসিক চাপ, একাকীত্ব ও অবসাদ। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, শহুরে জীবনের যান্ত্রিকতার কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ভারসাম্য ব্যাহত হচ্ছে।

কিন্তু এই চরম ব্যস্ততার মাঝেও কীভাবে নিজের জীবনকে একটু সহজ ও সুন্দর করা যায়? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লাইফস্টাইলে ছোট কিছু পরিবর্তনই এনে দিতে পারে কাঙ্ক্ষিত প্রশান্তি।

 

দিনের শুরুটা যেভাবে হয়, পুরো দিনের মন-মেজাজ অনেকটাই তার ওপর নির্ভর করে। ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল ফোনে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করা বা অফিসের ইমেইল চেক করার অভ্যাস ডেকে আনছে মারাত্মক মানসিক চাপ। এর বদলে ঘুম থেকে উঠে প্রথম ৩০ মিনিট ফোন থেকে দূরে থাকুন। এক গ্লাস জল খেয়ে বারান্দায় গিয়ে খানিকটা খোলা হাওয়া নিন কিংবা হালকা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করুন। এতে মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোনের ভারসাম্য ঠিক থাকে।

 

আমরা অনেকেই ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে বা মোবাইল টিপতে টিপতে দুপুরের খাবার খাই। পুষ্টিবিদদের মতে, একে বলে ‘অমনোযোগী আহার’। এতে খাবারের পুষ্টিগুণ শরীর ঠিকমতো গ্রহণ করতে পারে না, পাশাপাশি হজমেও সমস্যা হয়। খাবার খাওয়ার সময় সম্পূর্ণ মনোযোগ খাবারের স্বাদ, গন্ধ ও চিবানোর দিকে দিন। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার, তাজা ফলমূল এবং পর্যাপ্ত জল রাখুন।

 

অফিসের কাজের বাইরেও আমরা দিনের একটা বড় অংশ কাটায় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। বিশেষজ্ঞরা সপ্তাহে অন্তত একদিন বা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বা প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিশেষ করে ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের স্ক্রিন (মোবাইল, ল্যাপটপ, টিভি) বন্ধ করে দিন। এটি আপনার অনিদ্রার সমস্যা দূর করতে দারুণ কাজ করবে।

 

ইটের ওপর ইট দিয়ে গড়া এই শহরে সব সময় পার্কে যাওয়ার সুযোগ হয়তো মেলে না। তবে নিজের ঘর বা কাজের টেবিলটিতে ছোট একটি ইনডোর প্ল্যান্ট বা ইনডোর গাছ রাখতে পারেন। সবুজের দিকে তাকালে চোখের ক্লান্তি যেমন দূর হয়, তেমনি ঘরের বাতাসও শুদ্ধ থাকে। ছুটির দিনে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন।

 

সব কাজ একা করার মানসিকতা বা সবাইকে খুশি করার চেষ্টা নিজের ওপর মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। তাই নিজের ক্ষমতার বাইরে থাকা অনুরোধগুলোকে বিনয়ের সাথে ‘না’ বলতে শিখুন। প্রতিদিনের ব্যস্ত শিডিউলে নিজের জন্য অন্তত ১৫-২০ মিনিট রাখুন—যে সময়টায় আপনি শুধু নিজের পছন্দের কোনো গান শুনবেন, বই পড়বেন কিংবা ডায়েরি লিখবেন।

 

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতে, “লাইফস্টাইল মানে শুধু দামি পোশাক বা রেস্তোরাঁয় খাওয়া নয়। লাইফস্টাইল হলো আপনি আপনার শরীর ও মনকে কীভাবে পরিচালনা করছেন। মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা করে শারীরিক সুস্থতা সম্ভব নয়। তাই প্রতিদিনের রুটিনে নিজের মনকে ভালো রাখার ছোট ছোট উপাদান যুক্ত করতে হবে।”

ব্যস্ততা থাকবেই, তবে সেই ব্যস্ততার ভিড়ে নিজের ‘আমি’কে হারিয়ে ফেলা যাবে না। আজকের দিনটি থেকেই শুরু হোক আপনার জীবনের এই ইতিবাচক পরিবর্তন। একটু সচেতনতা আর সামান্য অভ্যাসের বদলই আপনাকে দিতে পারে একটি সুস্থ, সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন।

জনপ্রিয় সংবাদ

শেখ হাসিনা ফিরলে পুলিশ অকার্যকর’: অডিও কেলেঙ্কারিতে ক্যান্টনমেন্টের ওসি প্রত্যাহার, হাতকড়া পরানোর দাবি

ব্যস্ত নগরে প্রশান্তি: প্রতিদিনের জীবনে যেভাবে ফেরাবেন মানসিক ভারসাম্য

আপডেট সময় : ০৫:২৬:২৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাসেল চৌধুরী

সকাল হলেই অ্যালার্মের কর্কশ শব্দ, তাড়াহুড়ো করে তৈরি হওয়া, ট্রাফিক জ্যামের ধকল আর অফিসে কাজের পাহাড়—একটি সাধারণ শহরের মানুষের ২৪ ঘণ্টার চেনা ছবি এটি। প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর প্রতিযোগিতার এই যুগে আমাদের জীবনযাত্রা যেমন গতিশীল হয়েছে, ঠিক তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানসিক চাপ, একাকীত্ব ও অবসাদ। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, শহুরে জীবনের যান্ত্রিকতার কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ভারসাম্য ব্যাহত হচ্ছে।

কিন্তু এই চরম ব্যস্ততার মাঝেও কীভাবে নিজের জীবনকে একটু সহজ ও সুন্দর করা যায়? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লাইফস্টাইলে ছোট কিছু পরিবর্তনই এনে দিতে পারে কাঙ্ক্ষিত প্রশান্তি।

 

দিনের শুরুটা যেভাবে হয়, পুরো দিনের মন-মেজাজ অনেকটাই তার ওপর নির্ভর করে। ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল ফোনে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করা বা অফিসের ইমেইল চেক করার অভ্যাস ডেকে আনছে মারাত্মক মানসিক চাপ। এর বদলে ঘুম থেকে উঠে প্রথম ৩০ মিনিট ফোন থেকে দূরে থাকুন। এক গ্লাস জল খেয়ে বারান্দায় গিয়ে খানিকটা খোলা হাওয়া নিন কিংবা হালকা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করুন। এতে মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোনের ভারসাম্য ঠিক থাকে।

 

আমরা অনেকেই ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে বা মোবাইল টিপতে টিপতে দুপুরের খাবার খাই। পুষ্টিবিদদের মতে, একে বলে ‘অমনোযোগী আহার’। এতে খাবারের পুষ্টিগুণ শরীর ঠিকমতো গ্রহণ করতে পারে না, পাশাপাশি হজমেও সমস্যা হয়। খাবার খাওয়ার সময় সম্পূর্ণ মনোযোগ খাবারের স্বাদ, গন্ধ ও চিবানোর দিকে দিন। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার, তাজা ফলমূল এবং পর্যাপ্ত জল রাখুন।

 

অফিসের কাজের বাইরেও আমরা দিনের একটা বড় অংশ কাটায় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। বিশেষজ্ঞরা সপ্তাহে অন্তত একদিন বা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বা প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিশেষ করে ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের স্ক্রিন (মোবাইল, ল্যাপটপ, টিভি) বন্ধ করে দিন। এটি আপনার অনিদ্রার সমস্যা দূর করতে দারুণ কাজ করবে।

 

ইটের ওপর ইট দিয়ে গড়া এই শহরে সব সময় পার্কে যাওয়ার সুযোগ হয়তো মেলে না। তবে নিজের ঘর বা কাজের টেবিলটিতে ছোট একটি ইনডোর প্ল্যান্ট বা ইনডোর গাছ রাখতে পারেন। সবুজের দিকে তাকালে চোখের ক্লান্তি যেমন দূর হয়, তেমনি ঘরের বাতাসও শুদ্ধ থাকে। ছুটির দিনে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন।

 

সব কাজ একা করার মানসিকতা বা সবাইকে খুশি করার চেষ্টা নিজের ওপর মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। তাই নিজের ক্ষমতার বাইরে থাকা অনুরোধগুলোকে বিনয়ের সাথে ‘না’ বলতে শিখুন। প্রতিদিনের ব্যস্ত শিডিউলে নিজের জন্য অন্তত ১৫-২০ মিনিট রাখুন—যে সময়টায় আপনি শুধু নিজের পছন্দের কোনো গান শুনবেন, বই পড়বেন কিংবা ডায়েরি লিখবেন।

 

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতে, “লাইফস্টাইল মানে শুধু দামি পোশাক বা রেস্তোরাঁয় খাওয়া নয়। লাইফস্টাইল হলো আপনি আপনার শরীর ও মনকে কীভাবে পরিচালনা করছেন। মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা করে শারীরিক সুস্থতা সম্ভব নয়। তাই প্রতিদিনের রুটিনে নিজের মনকে ভালো রাখার ছোট ছোট উপাদান যুক্ত করতে হবে।”

ব্যস্ততা থাকবেই, তবে সেই ব্যস্ততার ভিড়ে নিজের ‘আমি’কে হারিয়ে ফেলা যাবে না। আজকের দিনটি থেকেই শুরু হোক আপনার জীবনের এই ইতিবাচক পরিবর্তন। একটু সচেতনতা আর সামান্য অভ্যাসের বদলই আপনাকে দিতে পারে একটি সুস্থ, সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন।