ইঞ্জিন বিকল হয়ে ৩ দিন ভাসমান ট্রলার; মাঝরাতের ঝড়ে ২৮ কিলোমিটার টেনে আনল যুদ্ধজাহাজ ‘পদ্মা’
ইকবাল উদ্দিন :
চারদিকে কেবলই রাক্ষুসে ঢেউ আর নিকষ কালো অন্ধকার। ৩ নম্বর সতর্ক সংকেতের জাঁতাকলে পিষ্ট বঙ্গোপসাগর তখন রীতিমতো রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। সি স্টেট-৪ মাত্রার সেই উত্তাল সাগরের বুকে টানা তিন দিন ধরে ভাসছিল ইঞ্জিন বিকল হওয়া পটুয়াখালীর একটি মাছ ধরার ট্রলার। ফুরিয়ে আসছিল ১২ জন জেলের বেঁচে থাকার আশা। ঠিক তেমনই এক নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ওই ১২ জেলেকে ফিরিয়ে এনেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে গভীর সমুদ্রে এক অবিশ্বাস্য ও রোমাঞ্চকর অভিযান চালিয়ে বিকল ট্রলার ‘এফবি নাঈম’ সহ সব জেলেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘পদ্মা’ । আজ শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এই নাটকীয় উদ্ধারের খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়।
গত ৮ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীর পায়রা বন্দর থেকে বুকভরা আশা নিয়ে সাগরে জাল ফেলতে রওনা হয়েছিলেন জেলেরা । কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না। পরদিনই (৯ সেপ্টেম্বর) মাঝসাগরে হঠাৎ বিকল হয়ে পড়ে ট্রলারের মূল ইঞ্জিন। সাগরে তখন ধেয়ে আসছিল ঝড়ো হাওয়া, ঢেউয়ের তোড়ে ট্রলারটি খেলনার মতো দুলছিল। দিকবিদিকহীন অবস্থায় সাগরের স্রোতে ভাসতে ভাসতে জেলেরা যখন সব আশা ছেড়ে দিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছিলেন, ঠিক তখনই ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয় নৌবাহিনীর টহলি জাহাজ।
ঝড়-বৃষ্টি আর উত্তাল ঢেউয়ের কারণে রাতের সাগরে দৃশ্যমানতা ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়। এমন বৈরী পরিস্থিতিতেও হাল ছাড়েননি নৌবাহিনীর অকুতোভয় ক্রু সদস্যরা। জাহাজের অত্যাধুনিক রাডার প্রযুক্তির সাহায্যে নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা হয় ট্রলারটির অবস্থান । রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রবল ঢেউয়ের তোড় সামলে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে ‘এফবি নাঈম’-এর পাশে গিয়ে নোঙর করে যুদ্ধজাহাজ ‘পদ্মা’।
উদ্ধার করার পরপরই ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত ও তীব্র আতঙ্কে কাঁপতে থাকা জেলেদের বুকে টেনে নেন নৌবাহিনীর জোয়ানরা । তাদের দেওয়া হয় গরম খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও পরম মানসিক সান্ত্বনা। সাগরের ঢেউয়ের আঘাতে আহত এক জেলেকে জাহাজেই জরুরি চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়।
তবে উদ্ধারেই শেষ নয়; মূল চ্যালেঞ্জ ছিল উত্তাল সাগরে বিকল ট্রলারটিকে টেনে নিয়ে যাওয়া। সব বাধা উপেক্ষা করে গভীর সমুদ্র থেকে ট্রলারটিকে দড়ি দিয়ে বেঁধে টানা ২৮ কিলোমিটার পথ টেনে সুন্দরবনের দুবলার চরের কাছে নিয়ে আসে নৌবাহিনীর জাহাজটি।
আজ শুক্রবার সেখানে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের আউটপোস্টে অক্ষত অবস্থায় ১২ জেলে ও তাদের ট্রলারটি হস্তান্তর করা হয় ।
সমুদ্রের বুকে এই সফল অভিযান আবারও প্রমাণ করল—দেশমাতৃকার জলসীমা রক্ষা করার পাশাপাশি যেকোনো দুর্যোগে সাগরে ভাসমান মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল বাংলাদেশ নৌবাহিনী ।























