ঢাকা ১১:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজনীতির গতিপথ: সংস্কারের গোলকধাঁধা বনাম অক্ষুণ্ণ রাজপথের ঐকমত্য

  • আপডেট সময় : ০৫:৫৪:১২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 16

রাসেল চৌধুরী

 

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ব্যাকরণ এখন এক অদ্ভুত ও অভূতপূর্ব সমান্তরালে হাঁটছে। একদিকে চলছে রাষ্ট্র ও সংবিধান ঢেলে সাজানোর পদ্ধতিগত লড়াই, আর অন্যদিকে রাজপথের এককালের প্রবল প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার প্রশ্নে তৈরি হয়েছে এক অলিখিত ইস্পাতকঠিন ঐক্য। ক্ষমতার অলিন্দে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্পর্ক যখন আদায়-কাঁচকলায় রূপ নেওয়ার পথে, ঠিক তখনই একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে এসে তাদের চিন্তার রেখা হুবহু এক হয়ে মিলছে।

চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ক্ষমতার ভরকেন্দ্রগুলোর কৌশলগত অবস্থান বিশ্লেষণ করলে এই বিপরীতমুখী অথচ সত্য চিত্রটি স্পষ্ট ধরা পড়ে।

 

জুলাই আন্দোলনের পর যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম হয়েছে, তার মূল স্পন্দন নিহিত ছিল শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের মধ্যে। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথ নিয়ে সংসদ এখন দ্বিধাবিভক্ত।

ক্ষমতাসীন পক্ষের অবস্থান অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও আইনি প্রক্রিয়ানির্ভর। তাদের নীতি হলো—আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে জাতীয় সমঝোতা বা রূপরেখা তৈরি হয়েছে, তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে বিদ্যমান সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমেই এগোতে হবে। আইনি ভিত্তি ছাড়া যেকোনো সংস্কার ভবিষ্যৎ সংকটের জন্ম দিতে পারে। সরকার বারবার এটিই আশ্বস্ত করছে যে, রাজপথের প্রতিশ্রুতির সাথে তাদের কোনো আপস নেই, কেবল আইনি পথটি সুগম করা হচ্ছে।

 

অপরদিকে, বিরোধী শিবিরের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা। তারা বিদ্যমান ব্যবস্থার আংশিক বা খণ্ডিত কোনো সংশোধনীকে মেনে নিতে নারাজ। তাদের দাবি—শাসনতন্ত্রের এই রূপান্তর হতে হবে সামগ্রিক, যা কেবল একটি সাধারণ সংসদীয় কমিটির টেবিলে বসে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এই পদ্ধতিগত বিরোধের কারণেই সংস্কার প্রক্রিয়ায় এক ধরনের ধীরগতি স্পষ্ট, যেখানে এক পক্ষ টেবিল গুছিয়ে বসার অপেক্ষায় রয়েছে, আর অন্য পক্ষ প্রক্রিয়াটিকেই বয়কট করে দূরে দাঁড়িয়ে আছে।

 

সংস্কারের প্রক্রিয়া নিয়ে সংসদের ভেতরে দুই মেরুর অবস্থান যতই অনড় হোক না কেন, পতিত রাজনৈতিক শক্তিকে প্রতিহত করার প্রশ্নে দুই পক্ষ একই সমান্তরালে দাঁড়িয়ে। ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং বিগত আমলের অপরাধের সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত কঠোর উদ্যোগে বিরোধী দলগুলোর কোনো দ্বিমত নেই।

বরং, আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পতিত স্বৈরাচারের যেকোনো ধরণের অপতৎপরতা বা রাজনৈতিক পুনর্বাসনের চেষ্টা রুখে দিতে উভয় পক্ষই সমভাবে অনড়। যেকোনো জাতীয় সংকটে বা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ ভুলে এক সারিতে দাঁড়াতে পারে—পতিত শক্তির মোকাবিলা করার এই অভিন্ন অবস্থানই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

 

বর্তমান সংসদের এই দ্বিমুখী রূপ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং ইতিবাচক অভিজ্ঞতা। একদিকে সংস্কারের পদ্ধতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক, ভিন্নমত প্রকাশ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বকীয়তা বজায় থাকছে; যা একটি প্রাণবন্ত সংসদের লক্ষণ। আবার অন্যদিকে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও বৃহৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে দলগুলো নিজেদের দূরত্ব ভুলে এক হয়ে কাজ করছে।

সংসদের এই টানাপড়েন ও অভ্যন্তরীণ বোঝাপড়া শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে কোন গন্তব্যে নিয়ে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। তবে আপাতদৃষ্টিতে এটি স্পষ্ট যে, পদ্ধতি নিয়ে তর্ক যতই থাকুক, রাজপথের প্রধান অর্জনগুলোকে ধূলিসাৎ হতে না দেওয়ার প্রশ্নে দুই পক্ষই সতর্ক প্রহরী।

জনপ্রিয় সংবাদ

শেখ হাসিনা ফিরলে পুলিশ অকার্যকর’: অডিও কেলেঙ্কারিতে ক্যান্টনমেন্টের ওসি প্রত্যাহার, হাতকড়া পরানোর দাবি

রাজনীতির গতিপথ: সংস্কারের গোলকধাঁধা বনাম অক্ষুণ্ণ রাজপথের ঐকমত্য

আপডেট সময় : ০৫:৫৪:১২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাসেল চৌধুরী

 

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ব্যাকরণ এখন এক অদ্ভুত ও অভূতপূর্ব সমান্তরালে হাঁটছে। একদিকে চলছে রাষ্ট্র ও সংবিধান ঢেলে সাজানোর পদ্ধতিগত লড়াই, আর অন্যদিকে রাজপথের এককালের প্রবল প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার প্রশ্নে তৈরি হয়েছে এক অলিখিত ইস্পাতকঠিন ঐক্য। ক্ষমতার অলিন্দে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্পর্ক যখন আদায়-কাঁচকলায় রূপ নেওয়ার পথে, ঠিক তখনই একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে এসে তাদের চিন্তার রেখা হুবহু এক হয়ে মিলছে।

চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ক্ষমতার ভরকেন্দ্রগুলোর কৌশলগত অবস্থান বিশ্লেষণ করলে এই বিপরীতমুখী অথচ সত্য চিত্রটি স্পষ্ট ধরা পড়ে।

 

জুলাই আন্দোলনের পর যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম হয়েছে, তার মূল স্পন্দন নিহিত ছিল শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের মধ্যে। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথ নিয়ে সংসদ এখন দ্বিধাবিভক্ত।

ক্ষমতাসীন পক্ষের অবস্থান অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও আইনি প্রক্রিয়ানির্ভর। তাদের নীতি হলো—আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে জাতীয় সমঝোতা বা রূপরেখা তৈরি হয়েছে, তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে বিদ্যমান সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমেই এগোতে হবে। আইনি ভিত্তি ছাড়া যেকোনো সংস্কার ভবিষ্যৎ সংকটের জন্ম দিতে পারে। সরকার বারবার এটিই আশ্বস্ত করছে যে, রাজপথের প্রতিশ্রুতির সাথে তাদের কোনো আপস নেই, কেবল আইনি পথটি সুগম করা হচ্ছে।

 

অপরদিকে, বিরোধী শিবিরের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা। তারা বিদ্যমান ব্যবস্থার আংশিক বা খণ্ডিত কোনো সংশোধনীকে মেনে নিতে নারাজ। তাদের দাবি—শাসনতন্ত্রের এই রূপান্তর হতে হবে সামগ্রিক, যা কেবল একটি সাধারণ সংসদীয় কমিটির টেবিলে বসে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এই পদ্ধতিগত বিরোধের কারণেই সংস্কার প্রক্রিয়ায় এক ধরনের ধীরগতি স্পষ্ট, যেখানে এক পক্ষ টেবিল গুছিয়ে বসার অপেক্ষায় রয়েছে, আর অন্য পক্ষ প্রক্রিয়াটিকেই বয়কট করে দূরে দাঁড়িয়ে আছে।

 

সংস্কারের প্রক্রিয়া নিয়ে সংসদের ভেতরে দুই মেরুর অবস্থান যতই অনড় হোক না কেন, পতিত রাজনৈতিক শক্তিকে প্রতিহত করার প্রশ্নে দুই পক্ষ একই সমান্তরালে দাঁড়িয়ে। ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং বিগত আমলের অপরাধের সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত কঠোর উদ্যোগে বিরোধী দলগুলোর কোনো দ্বিমত নেই।

বরং, আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পতিত স্বৈরাচারের যেকোনো ধরণের অপতৎপরতা বা রাজনৈতিক পুনর্বাসনের চেষ্টা রুখে দিতে উভয় পক্ষই সমভাবে অনড়। যেকোনো জাতীয় সংকটে বা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ ভুলে এক সারিতে দাঁড়াতে পারে—পতিত শক্তির মোকাবিলা করার এই অভিন্ন অবস্থানই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

 

বর্তমান সংসদের এই দ্বিমুখী রূপ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং ইতিবাচক অভিজ্ঞতা। একদিকে সংস্কারের পদ্ধতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক, ভিন্নমত প্রকাশ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বকীয়তা বজায় থাকছে; যা একটি প্রাণবন্ত সংসদের লক্ষণ। আবার অন্যদিকে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও বৃহৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে দলগুলো নিজেদের দূরত্ব ভুলে এক হয়ে কাজ করছে।

সংসদের এই টানাপড়েন ও অভ্যন্তরীণ বোঝাপড়া শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে কোন গন্তব্যে নিয়ে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। তবে আপাতদৃষ্টিতে এটি স্পষ্ট যে, পদ্ধতি নিয়ে তর্ক যতই থাকুক, রাজপথের প্রধান অর্জনগুলোকে ধূলিসাৎ হতে না দেওয়ার প্রশ্নে দুই পক্ষই সতর্ক প্রহরী।