বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থানরত দলীয় জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সম্পন্ন করেছেন।
গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর ) রাতে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে এই দীর্ঘপ্রতীক্ষিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে এটিই ছিল শেখ হাসিনার প্রথম বড় ধরনের আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক সমন্বয় সভা।
দলীয় ও নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, নীতিনির্ধারণী এই বৈঠকটি প্রথমে সম্পূর্ণ সশরীরে ব্ করার কথা ছিল এবং এ লক্ষ্যে বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা ইতিমধ্যে দিল্লিতে পৌঁছান। তবে শেষ মুহূর্তে ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতীয় হাই কমিশনারের কাছে দেওয়া বিশেষ বার্তা ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে সশরীরে বৈঠকের বড় আসরটি বাতিল করা হয়। এর পরিবর্তে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে ভার্চুয়াল মাধ্যমকে বেছে নেওয়া হয়। ক্রিসম রঙের একটি তিনতলা ভবনে বসে শেখ হাসিনা সরাসরি উপস্থিত অল্প কয়েকজন নেতার সঙ্গে বসেন এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা কার্যনির্বাহী সংসদ ও সম্পাদকমণ্ডলীর অন্য নেতারা এতে অনলাইনের মাধ্যমে যুক্ত হন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া ও দলীয় সূত্রের তথ্যমতে, নীতিনির্ধারণী এই সভার প্রধান ফোকাস ছিল দলের রাজনৈতিক, আইনি ও সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণ। সেখানে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার এবং আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছেন। তবে এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের আগে মাঠপর্যায় থেকে শুরু করে দলের কেন্দ্র পর্যন্ত নতুন করে পুনর্গঠন করাই ছিল আলোচনার মূল চালিকাশক্তি।
বৈঠকে সাংগঠনিক আলোচনার সবচেয়ে বড় চমক ছিল দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করার পর, শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ ও মূল নীতিনির্ধারণী নেতৃত্বে নিয়ে আসার বিষয়ে বিস্তারিত এবং ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
এছাড়া দলের শূন্য হওয়া সভাপতিমণ্ডলীর দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের দু’জন প্রভাবশালী নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে।
দলটির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানাচ্ছে, বর্তমানে আওয়ামী লীগের মূল কেন্দ্রীয় কমিটিতে সরাসরি যুক্ত নন, কিন্তু ২০২৪-পরবর্তী দলের চরম সংকটের সময়ে বিশ্বস্ততা ও কার্যকারিতা প্রমাণ করেছেন—এমন বেশ কয়েকজন তরুণ ও প্রগতিশীল মুখকে দিল্লির ওই ভবনে শেখ হাসিনার সামনে সরাসরি উপস্থিত রাখা হয়েছিল। আগামী দিনে দলকে নতুন অবয়বে দাঁড় করাতে এদের দ্রুত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে যুক্ত করার সুস্পষ্ট তাগিদ দিয়েছেন দলীয় প্রধান।
দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের এই উচ্চপর্যায়ের ভার্চ্যুয়াল বৈঠকটি এমন এক সময়ে সম্পন্ন হলো, যার মাত্র কয়েক দিন আগেই দেশের জাতীয় সংসদে দলটির কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞার আইনি ভিত্তি জোরদার করা হয়েছে। ফলে দিল্লির এই গোপন সমন্বয়ের পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি হয় কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে।





















