ঢাকা ০৬:১০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সান সিরোর ‘রাজপুত্র’ আর নেই: ফুটবল রোমান্টিকতার এক সোনালি অধ্যায়ের অবসান

  • আপডেট সময় : ০৬:৪৩:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 2

রাসেল চৌধুরী

ফুটবল কি কেবলই ৯০ মিনিটের গোল আর ড্রিবলিংয়ের গল্প? নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু? যারা ফুটবলকে জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো রোমান্টিক চোখে দেখতে ভালোবাসেন, আজ তাদের মন খারাপের দিন। মিলানের নীল-কালো আকাশ আজ একটু বেশিই মেঘলা। ইন্টার মিলান ও ইতালীয় ফুটবলের রূপকথার মহানায়ক, সেই চিরচেনা রাজকীয় গোঁফ আর বুদ্ধিদীপ্ত চোখের সান্দ্রো মাজ্জোলা আর নেই। ৮৩ বছর বয়সে সান সিরোর এই চিরসবুজ বাতিঘর নেভে গেল। ক্লাবের তরফ থেকে এক আবেগঘন বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক অনন্য অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে

 

সান্দ্রোর গল্পটা শুরু হয়েছিল এক চরম বিষাদ দিয়ে। বয়স যখন মাত্র ছয়, তখন ১৯৪৯ সালের সেই অভিশপ্ত সুপারগা বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর বাবা—তৎকালীন ইতালির কিংবদন্তি অধিনায়ক ভ্যালেন্তিনো মাজ্জোলা পুরো তোরিনো দলসহ প্রাণ হারান। ফুটবল দুনিয়া ভেবেছিল, মাজ্জোলা বংশের ফুটবল বোধহয় ওখানেই শেষ। কিন্তু নিয়তি অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। বাবার ছায়া মাড়িয়ে, সেই শোককে শক্তিতে রূপ দিয়ে সান্দ্রো যখন ইন্টার মিলানের আঙিনায় পা রাখলেন, তখন জন্ম নিল এক নতুন ফিনিক্স পাখি।

 

১৮ বছর বয়সের সেই অভিষেক ম্যাচটিই তো একটা আস্ত সিনেমা! জুভেন্টাসের বিপক্ষে ম্যাচ, সকালে স্কুলের তিনটি কঠিন পরীক্ষা (ইংরেজি, ব্যাংকিং টেকনিক ও পলিটিক্যাল ইকোনমি) শেষ করে ট্যাক্সি ছুটিয়ে মাঠে এসেছিলেন কিশোর সান্দ্রো। ইন্টারের যুব দল সেবার সিনিয়রদের প্রতিবাদের অংশ হিসেবে খেলতে নেমে ৯-১ গোলে হেরেছিল, কিন্তু পেনাল্টি থেকে ক্লাবের একমাত্র গোলটি করে দুনিয়াকে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। ম্যাচ শেষে জুভেন্টাস কিংবদন্তি বোনিপার্তি তাঁর হাত ধরে বলেছিলেন, তুমি তোমার বাবার যোগ্য উত্তরসূরি।

 

আজকের যুগে যখন টাকার ঝনঝনানিতে খেলোয়াড়েরা প্রতি মৌসুমে ক্লাব বদল করেন, সেখানে সান্দ্রো মাজ্জোলা ছিলেন এক বিরল ‘ওয়ান-ম্যান আর্মি’। ১৯৬০ থেকে ১৯৭৭—দীর্ঘ ১৭টি বছর বুটের ফিতে বেঁধেছেন কেবল ইন্টার মিলানের নীল-কালো জার্সির জন্যই। ৫৭৬টি ম্যাচ, ১৬২টি গোল আর তার চেয়েও বড় কথা—মাঝমাঠ আর আক্রমণভাগের সেই জাদুকরী নিয়ন্ত্রণ, যা ইন্টারকে এনে দিয়েছিল ‘গ্রান্দে ইন্টার’ বা ‘মহান ইন্টার’ এর খেতাব।

 

তাঁর ট্রফি ক্যাবিনেট রূপকথার চেয়ে কম নয়। ৪টি সেরি আ, ২টি ইউরোপিয়ান কাপ (বর্তমান চ্যাম্পিয়নস লিগ) এবং ২টি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ। ১৯৬৪ সালের সেই বিখ্যাত ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালের কথা কার না মনে আছে? রিয়াল মাদ্রিদের পুসকাস-ডি স্টিফেনোদের দম্ভ চূর্ণ করে সান্দ্রোর জোড়া গোলে ৩-১ ব্যবধানে জিতেছিল ইন্টার। ম্যাচ শেষে কিংবদন্তি ফেরেঙ্ক পুসকাস নিজের ১০ নম্বর জার্সিটি সান্দ্রোকে উপহার দিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন। ১৯৭১ সালের ব্যালন ডি’অরে জোহান ক্রুইফের ঠিক পেছনে থেকে দ্বিতীয় হওয়া এই জাদুকর ইতালির জার্সিতেও ছিলেন সমান উজ্জ্বল। ১৯৬৮ সালে আজ্জুরিদের ইউরো জেতানো কিংবা ১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপে পেলে-টোস্টাওদের ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক ফাইনাল—সবখানেই জড়িয়ে আছে তাঁর নাম।

 

খেলোয়াড়ি জীবন ছাড়ার পরও ফুটবলের মায়া কাটাতে পারেননি। ইন্টারের স্পোর্টিং ডিরেক্টর হিসেবে যখন দায়িত্ব নিলেন, সেখানেও দেখালেন জহুরির চোখ। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার, ব্রাজিলের ‘দ্য ফেনোমেনন’ রোনালদো নাজারিওকে সান সিরোর নীল-কালো শিবিরে উড়িয়ে আনার মূল মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এই মাজ্জোলাই! ৯০ এর দশকে ধারাভাষ্যকার হিসেবে তাঁর চেনা কণ্ঠটি ইতালির প্রতিটি ড্রয়িংরুমে ফুটবল রোমান্টিকতা ছড়িয়ে দিত।

 

ইন্টার মিলান তাদের বিবৃতিতে লিখেছে, “সান্দ্রো শুধু আমাদের ইতিহাসের অংশ নন, তিনি নিজেই ছিলেন ইন্টার।” সম্প্রতি মে ২০২৪-এ ইন্টারের ২০তম লিগ জয়ের উদযাপনেও লাঠিতে ভর দিয়ে সান সিরোর চেনা ঘাসে এসেছিলেন তিনি, দর্শকদের করতালিতে ভিজেছিল তাঁর চোখ।

সান্দ্রো মাজ্জোলা একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমার শেষ ইচ্ছা—লোকে যেন আমাকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে মনে রাখে, যে অসম্ভব জেনেও ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাল ছাড়ে না।

 

বিদায় হে মহানায়ক! ফুটবল রোমান্টিকতার পাতায় আপনার রাজকীয় গোঁফ আর অবিশ্বাস্য সব ড্রিবলিংয়ের গল্প চিরকাল অমলিন থাকবে। সান সিরোর আকাশে আজ থেকে এক নতুন নক্ষত্র জ্বলবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মাইজভাণ্ডারী তরিকায় আত্মনিবেদন ও ইশকের অনন্য উপাখ্যান: খলিফায়ে গাউসুল আজম আব্দুল আজিম মাইজভান্ডারী

সান সিরোর ‘রাজপুত্র’ আর নেই: ফুটবল রোমান্টিকতার এক সোনালি অধ্যায়ের অবসান

আপডেট সময় : ০৬:৪৩:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাসেল চৌধুরী

ফুটবল কি কেবলই ৯০ মিনিটের গোল আর ড্রিবলিংয়ের গল্প? নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু? যারা ফুটবলকে জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো রোমান্টিক চোখে দেখতে ভালোবাসেন, আজ তাদের মন খারাপের দিন। মিলানের নীল-কালো আকাশ আজ একটু বেশিই মেঘলা। ইন্টার মিলান ও ইতালীয় ফুটবলের রূপকথার মহানায়ক, সেই চিরচেনা রাজকীয় গোঁফ আর বুদ্ধিদীপ্ত চোখের সান্দ্রো মাজ্জোলা আর নেই। ৮৩ বছর বয়সে সান সিরোর এই চিরসবুজ বাতিঘর নেভে গেল। ক্লাবের তরফ থেকে এক আবেগঘন বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক অনন্য অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে

 

সান্দ্রোর গল্পটা শুরু হয়েছিল এক চরম বিষাদ দিয়ে। বয়স যখন মাত্র ছয়, তখন ১৯৪৯ সালের সেই অভিশপ্ত সুপারগা বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর বাবা—তৎকালীন ইতালির কিংবদন্তি অধিনায়ক ভ্যালেন্তিনো মাজ্জোলা পুরো তোরিনো দলসহ প্রাণ হারান। ফুটবল দুনিয়া ভেবেছিল, মাজ্জোলা বংশের ফুটবল বোধহয় ওখানেই শেষ। কিন্তু নিয়তি অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। বাবার ছায়া মাড়িয়ে, সেই শোককে শক্তিতে রূপ দিয়ে সান্দ্রো যখন ইন্টার মিলানের আঙিনায় পা রাখলেন, তখন জন্ম নিল এক নতুন ফিনিক্স পাখি।

 

১৮ বছর বয়সের সেই অভিষেক ম্যাচটিই তো একটা আস্ত সিনেমা! জুভেন্টাসের বিপক্ষে ম্যাচ, সকালে স্কুলের তিনটি কঠিন পরীক্ষা (ইংরেজি, ব্যাংকিং টেকনিক ও পলিটিক্যাল ইকোনমি) শেষ করে ট্যাক্সি ছুটিয়ে মাঠে এসেছিলেন কিশোর সান্দ্রো। ইন্টারের যুব দল সেবার সিনিয়রদের প্রতিবাদের অংশ হিসেবে খেলতে নেমে ৯-১ গোলে হেরেছিল, কিন্তু পেনাল্টি থেকে ক্লাবের একমাত্র গোলটি করে দুনিয়াকে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। ম্যাচ শেষে জুভেন্টাস কিংবদন্তি বোনিপার্তি তাঁর হাত ধরে বলেছিলেন, তুমি তোমার বাবার যোগ্য উত্তরসূরি।

 

আজকের যুগে যখন টাকার ঝনঝনানিতে খেলোয়াড়েরা প্রতি মৌসুমে ক্লাব বদল করেন, সেখানে সান্দ্রো মাজ্জোলা ছিলেন এক বিরল ‘ওয়ান-ম্যান আর্মি’। ১৯৬০ থেকে ১৯৭৭—দীর্ঘ ১৭টি বছর বুটের ফিতে বেঁধেছেন কেবল ইন্টার মিলানের নীল-কালো জার্সির জন্যই। ৫৭৬টি ম্যাচ, ১৬২টি গোল আর তার চেয়েও বড় কথা—মাঝমাঠ আর আক্রমণভাগের সেই জাদুকরী নিয়ন্ত্রণ, যা ইন্টারকে এনে দিয়েছিল ‘গ্রান্দে ইন্টার’ বা ‘মহান ইন্টার’ এর খেতাব।

 

তাঁর ট্রফি ক্যাবিনেট রূপকথার চেয়ে কম নয়। ৪টি সেরি আ, ২টি ইউরোপিয়ান কাপ (বর্তমান চ্যাম্পিয়নস লিগ) এবং ২টি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ। ১৯৬৪ সালের সেই বিখ্যাত ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালের কথা কার না মনে আছে? রিয়াল মাদ্রিদের পুসকাস-ডি স্টিফেনোদের দম্ভ চূর্ণ করে সান্দ্রোর জোড়া গোলে ৩-১ ব্যবধানে জিতেছিল ইন্টার। ম্যাচ শেষে কিংবদন্তি ফেরেঙ্ক পুসকাস নিজের ১০ নম্বর জার্সিটি সান্দ্রোকে উপহার দিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন। ১৯৭১ সালের ব্যালন ডি’অরে জোহান ক্রুইফের ঠিক পেছনে থেকে দ্বিতীয় হওয়া এই জাদুকর ইতালির জার্সিতেও ছিলেন সমান উজ্জ্বল। ১৯৬৮ সালে আজ্জুরিদের ইউরো জেতানো কিংবা ১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপে পেলে-টোস্টাওদের ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক ফাইনাল—সবখানেই জড়িয়ে আছে তাঁর নাম।

 

খেলোয়াড়ি জীবন ছাড়ার পরও ফুটবলের মায়া কাটাতে পারেননি। ইন্টারের স্পোর্টিং ডিরেক্টর হিসেবে যখন দায়িত্ব নিলেন, সেখানেও দেখালেন জহুরির চোখ। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার, ব্রাজিলের ‘দ্য ফেনোমেনন’ রোনালদো নাজারিওকে সান সিরোর নীল-কালো শিবিরে উড়িয়ে আনার মূল মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এই মাজ্জোলাই! ৯০ এর দশকে ধারাভাষ্যকার হিসেবে তাঁর চেনা কণ্ঠটি ইতালির প্রতিটি ড্রয়িংরুমে ফুটবল রোমান্টিকতা ছড়িয়ে দিত।

 

ইন্টার মিলান তাদের বিবৃতিতে লিখেছে, “সান্দ্রো শুধু আমাদের ইতিহাসের অংশ নন, তিনি নিজেই ছিলেন ইন্টার।” সম্প্রতি মে ২০২৪-এ ইন্টারের ২০তম লিগ জয়ের উদযাপনেও লাঠিতে ভর দিয়ে সান সিরোর চেনা ঘাসে এসেছিলেন তিনি, দর্শকদের করতালিতে ভিজেছিল তাঁর চোখ।

সান্দ্রো মাজ্জোলা একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমার শেষ ইচ্ছা—লোকে যেন আমাকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে মনে রাখে, যে অসম্ভব জেনেও ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাল ছাড়ে না।

 

বিদায় হে মহানায়ক! ফুটবল রোমান্টিকতার পাতায় আপনার রাজকীয় গোঁফ আর অবিশ্বাস্য সব ড্রিবলিংয়ের গল্প চিরকাল অমলিন থাকবে। সান সিরোর আকাশে আজ থেকে এক নতুন নক্ষত্র জ্বলবে।