ঢাকা ০৬:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চন্দনাইশে ১৪০ হেক্টরে আখের বাম্পার ফলন, পকেটে টাকা মুখে হাসি চাষিদের

  • আপডেট সময় : ০৬:০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 7

রাসেল চৌধুরী

শরতের মিষ্টি হাওয়া বইছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশে। সেই বাতাসে দোল খাচ্ছে খেতের পর খেত আখের সবুজ পাতা। পাতার আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে দীর্ঘ, রসালো আর গাঢ় লালচে রঙের মিষ্টি আখ। যার পোশাকি নাম ‘রংবিলাস’। চন্দনাইশ উপজেলার মাঠগুলো এখন যেন উৎসবের রঙে রঙিন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার উপজেলায় আখের বাম্পার ফলন হয়েছে। খেত থেকে নতুন আখ কাটার ধুম লেগেছে, আর সেই সাথে চাষিদের মনে বইছে আনন্দের জোয়ার।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে চন্দনাইশে প্রায় ১৪০ হেক্টর জমিতে আখের আবাদ হয়েছে, যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় রেকর্ড পরিমাণ বেশি। আর এই চাষের সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশই কৃষকরা করেছেন অধিক লাভজনক ‘রংবিলাস’ জাতের আখ।

 

 

চন্দনাইশের দোহাজারী, দিয়াকুল, বৈলতলী, বরমা, সাতবাড়িয়া, মোহাম্মদখালী ও লালুটিয়া এলাকার মাঠগুলো ঘুরে দেখা যায়, চাষিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ খেত থেকে আখ কাটছেন, কেউ আঁটি বাঁধছেন, আবার কেউ পাইকারদের ট্রাকে আখ তুলে দিচ্ছেন।

 

আগে এখানকার কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী আঁশযুক্ত দেশি জাতের আখ চাষ করতেন। তবে গত কয়েক বছর ধরে সেই চিত্র বদলে গেছে। কৃষকরা এখন ঝুঁকছেন হাইব্রিড জাতের রংবিলাসের দিকে। এই আখ দেখতে যেমন দীর্ঘ ও আকর্ষণীয়, তেমনি এটি অত্যন্ত মিষ্টি ও রসালো। সাধারণ আখের চেয়ে এর রোগবালাই অনেক কম এবং শক্ত হওয়ায় ঝড়-তুফানে সহজে ভেঙে যায় না।

 

দিয়াকুল এলাকার প্রবীণ আখ চাষি মনজুর আলী আনন্দের হাসি চেপে রাখতে না পেরে বলেন অন্যান্য ফসলের পেছনে যে খাটুনি আর খরচ, আখে তার চেয়ে কষ্ট অনেক কম। এক কানি জমিতে আখ চাষ করতে আমাদের খরচ হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু পাইকাররা এসে মাঠ থেকেই পুরো খেত ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায় কিনে নিয়ে যায়! সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি কানিতে অনায়াসে দ্বিগুণ লাভ থাকে। এবার ফলন এত ভালো হয়েছে যে আমাদের পুরো এলাকার চাষিরা খুশি।

 

একই কথা জানালেন বৈলতলী এলাকার আরেক চাষি মনির আহমদ। তিনি বলেন, আখ নিয়ে আমাদের বাজারে গিয়ে বসে থাকার কোনো চিন্তা করতে হয় না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পাইকাররা ট্রাকে করে এসে জমি থেকেই আখ নগদ টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে যান। এক সাথে এতগুলো টাকা অন্য কোনো ফসল চাষ করে পাওয়া যায় না।

 

 

চট্টগ্রাম শহর ছাড়িয়ে চন্দনাইশের রংবিলাসের চাহিদা এখন ঢাকা, কুমিল্লা ও কক্সবাজারের বাজারেও। পাইকারি ব্যবসায়ীরা মাঠ থেকে প্রতি একশ আখ মানভেদে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় কিনে নিচ্ছেন।

 

এদিকে খুচরা বাজারেও এর রসালো স্বাদের জন্য ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। চট্টগ্রামের চকবাজার ও বহদ্দারহাট এলাকার খুচরা বাজারে চন্দনাইশের এক একটি রংবিলাস আখ আকারভেদে ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা জানান, গরমের কারণে বাজারে এখন আখের রসের ব্যাপক চাহিদা, তাই বিক্রিও হচ্ছে দেদারসে।

 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ আজাদ হোসেন জানান চলতি মৌসুমে চন্দনাইশে আখের ফলন চমৎকার হয়েছে। চন্দনাইশের মাটি ও জলবায়ু রংবিলাস জাতের আখ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কম খরচে ও স্বল্প শ্রমে দ্বিগুণ লাভ নিশ্চিত হওয়ায় কৃষকদের মাঝে আখ চাষের পরিধি ও জনপ্রিয়ত দুই-ই দিন দিন বাড়ছে। কৃষকরা যাতে কোনো ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন না হন এবং ভালো ফলন পান, সেজন্য আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে গিয়ে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে আসছেন।

 

সবুজ মাঠের এই রঙিন ‘রংবিলাস’ চন্দনাইশের প্রান্তিক কৃষকদের শুধু অর্থনৈতিক সচ্ছলতাই এনে দেয়নি, বরং এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মাইজভাণ্ডারী তরিকায় আত্মনিবেদন ও ইশকের অনন্য উপাখ্যান: খলিফায়ে গাউসুল আজম আব্দুল আজিম মাইজভান্ডারী

চন্দনাইশে ১৪০ হেক্টরে আখের বাম্পার ফলন, পকেটে টাকা মুখে হাসি চাষিদের

আপডেট সময় : ০৬:০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাসেল চৌধুরী

শরতের মিষ্টি হাওয়া বইছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশে। সেই বাতাসে দোল খাচ্ছে খেতের পর খেত আখের সবুজ পাতা। পাতার আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে দীর্ঘ, রসালো আর গাঢ় লালচে রঙের মিষ্টি আখ। যার পোশাকি নাম ‘রংবিলাস’। চন্দনাইশ উপজেলার মাঠগুলো এখন যেন উৎসবের রঙে রঙিন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার উপজেলায় আখের বাম্পার ফলন হয়েছে। খেত থেকে নতুন আখ কাটার ধুম লেগেছে, আর সেই সাথে চাষিদের মনে বইছে আনন্দের জোয়ার।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে চন্দনাইশে প্রায় ১৪০ হেক্টর জমিতে আখের আবাদ হয়েছে, যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় রেকর্ড পরিমাণ বেশি। আর এই চাষের সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশই কৃষকরা করেছেন অধিক লাভজনক ‘রংবিলাস’ জাতের আখ।

 

 

চন্দনাইশের দোহাজারী, দিয়াকুল, বৈলতলী, বরমা, সাতবাড়িয়া, মোহাম্মদখালী ও লালুটিয়া এলাকার মাঠগুলো ঘুরে দেখা যায়, চাষিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ খেত থেকে আখ কাটছেন, কেউ আঁটি বাঁধছেন, আবার কেউ পাইকারদের ট্রাকে আখ তুলে দিচ্ছেন।

 

আগে এখানকার কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী আঁশযুক্ত দেশি জাতের আখ চাষ করতেন। তবে গত কয়েক বছর ধরে সেই চিত্র বদলে গেছে। কৃষকরা এখন ঝুঁকছেন হাইব্রিড জাতের রংবিলাসের দিকে। এই আখ দেখতে যেমন দীর্ঘ ও আকর্ষণীয়, তেমনি এটি অত্যন্ত মিষ্টি ও রসালো। সাধারণ আখের চেয়ে এর রোগবালাই অনেক কম এবং শক্ত হওয়ায় ঝড়-তুফানে সহজে ভেঙে যায় না।

 

দিয়াকুল এলাকার প্রবীণ আখ চাষি মনজুর আলী আনন্দের হাসি চেপে রাখতে না পেরে বলেন অন্যান্য ফসলের পেছনে যে খাটুনি আর খরচ, আখে তার চেয়ে কষ্ট অনেক কম। এক কানি জমিতে আখ চাষ করতে আমাদের খরচ হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু পাইকাররা এসে মাঠ থেকেই পুরো খেত ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায় কিনে নিয়ে যায়! সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি কানিতে অনায়াসে দ্বিগুণ লাভ থাকে। এবার ফলন এত ভালো হয়েছে যে আমাদের পুরো এলাকার চাষিরা খুশি।

 

একই কথা জানালেন বৈলতলী এলাকার আরেক চাষি মনির আহমদ। তিনি বলেন, আখ নিয়ে আমাদের বাজারে গিয়ে বসে থাকার কোনো চিন্তা করতে হয় না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পাইকাররা ট্রাকে করে এসে জমি থেকেই আখ নগদ টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে যান। এক সাথে এতগুলো টাকা অন্য কোনো ফসল চাষ করে পাওয়া যায় না।

 

 

চট্টগ্রাম শহর ছাড়িয়ে চন্দনাইশের রংবিলাসের চাহিদা এখন ঢাকা, কুমিল্লা ও কক্সবাজারের বাজারেও। পাইকারি ব্যবসায়ীরা মাঠ থেকে প্রতি একশ আখ মানভেদে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় কিনে নিচ্ছেন।

 

এদিকে খুচরা বাজারেও এর রসালো স্বাদের জন্য ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। চট্টগ্রামের চকবাজার ও বহদ্দারহাট এলাকার খুচরা বাজারে চন্দনাইশের এক একটি রংবিলাস আখ আকারভেদে ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা জানান, গরমের কারণে বাজারে এখন আখের রসের ব্যাপক চাহিদা, তাই বিক্রিও হচ্ছে দেদারসে।

 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ আজাদ হোসেন জানান চলতি মৌসুমে চন্দনাইশে আখের ফলন চমৎকার হয়েছে। চন্দনাইশের মাটি ও জলবায়ু রংবিলাস জাতের আখ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কম খরচে ও স্বল্প শ্রমে দ্বিগুণ লাভ নিশ্চিত হওয়ায় কৃষকদের মাঝে আখ চাষের পরিধি ও জনপ্রিয়ত দুই-ই দিন দিন বাড়ছে। কৃষকরা যাতে কোনো ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন না হন এবং ভালো ফলন পান, সেজন্য আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে গিয়ে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে আসছেন।

 

সবুজ মাঠের এই রঙিন ‘রংবিলাস’ চন্দনাইশের প্রান্তিক কৃষকদের শুধু অর্থনৈতিক সচ্ছলতাই এনে দেয়নি, বরং এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।