অক্সিজেন মোড়ের দীর্ঘস্থায়ী যানজট ও জনভোগান্তি অবসানের আশা • চসিকের বড় সাফল্য
রাসেল চৌধুরী
দীর্ঘ ৩৩ বছরের গ্লানি ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে চালু হতে যাচ্ছে সব ধরনের আধুনিক সুবিধাসংবলিত তৃতীয় সিটি বাস টার্মিনাল। নগরীর জালালাবাদ ওয়ার্ডের কুলগাঁও-বালুচরা এলাকায় প্রায় ৮ দশমিক ১০ একর জমির ওপর নির্মিত এই ‘কুলগাঁও বাস ও ট্রাক টার্মিনাল’ চালুর মাধ্যমে চট্টগ্রামের গণপরিবহন খাতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হতে যাচ্ছে। চসিকের এই মেগা উদ্যোগের ফলে উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য জেলা রুটের পরিবহন ব্যবস্থায় যেমন শৃঙ্খলা ফিরবে, তেমনি নগরীর অন্যতম প্রবেশদ্বার অক্সিজেন মোড়ের দীর্ঘদিনের তীব্র যানজট থেকে রেহাই পাবেন লাখো মানুষ।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) উদ্যোগে নির্মিত এই মেগা প্রকল্পটির ভৌত কাজ এখন সম্পূর্ণ শেষের পথে। চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহেল জানান, প্রকল্পের অবকাঠামোগত সব কাজ গুছিয়ে আনা হয়েছে। মেয়র মহোদয় দেশে ফেরার পর চসিকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই আধুনিক টার্মিনালটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ১৯৯৩ সালে চট্টগ্রামে কদমতলী বাস টার্মিনাল চালুর পর গত ৩৩ বছরে আর কোনো স্থায়ী টার্মিনাল নির্মিত হয়নি। দীর্ঘকাল ধরে উত্তর চট্টগ্রাম, রাঙামাতি ও খাগড়াছড়ি রুটের দৈনিক ৫০০-এরও বেশি বাস স্থায়ী টার্মিনালের অভাবে অক্সিজেন ও মুরাদপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে রাস্তার ওপর অবৈধভাবে পার্কিং করত। এর ফলে এই রুটের লাখ লাখ যাত্রী যেমন চরম ভোগান্তিতে পড়তেন, তেমনি পুরো নগরীজুড়ে তীব্র যানজট লেগে থাকত। বর্তমান চসিক প্রশাসনের কঠোর তদারকি ও সদিচ্ছার ফলেই এই অচলাবস্থা কাটতে চলেছে।

প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই আধুনিক টার্মিনালটি দেশের অন্যতম একটি সুপরিকল্পিত পরিবহন হাব হতে যাচ্ছে। চসিকের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই ৩ তলাবিশিষ্ট মূল টার্মিনাল ভবনে থাকবে ২৫টি প্যাসেঞ্জার বোর্ডিং লেন এবং ১৪টি অতিরিক্ত ওয়েটিং লেন। একসঙ্গে ২০০টিরও বেশি বাস ও ট্রাক নিরাপদে পার্কিং করার বিশাল চত্বর ছাড়াও এখানে থাকছে একটি সুবিশাল ওয়েটিং হল, তথ্যকেন্দ্র, সুসজ্জিত ২২টি টিকিট কাউন্টার এবং পুরো টার্মিনাল জুড়ে ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধা। দূরপাল্লার বাস চালক ও সহকারীদের বিশ্রামের জন্য আধুনিক আবাসন ব্যবস্থা ও ডরমিটরির পাশাপাশি পুরুষ ও নারীদের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক আধুনিক শৌচাগার ও সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।

প্রকল্পটির গুরুত্ব তুলে ধরে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “আমরা একটি সুশৃঙ্খল, পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব সবুজ চট্টগ্রাম গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই বাস টার্মিনাল চালুর মাধ্যমে শুধু উত্তর চট্টগ্রামের পরিবহন ব্যবস্থাই বদলে যাবে না, বরং পুরো চট্টগ্রামকে যানজটের অভিশাপ থেকে মুক্ত করার যে মিশন আমরা হাতে নিয়েছি, এটি তারই একটি বড় মাইলফলক। আমরা শহরের প্রতিটি প্রবেশমুখে সুশৃঙ্খল টার্মিনাল করার যে পরিকল্পনা করেছি, কুলগাঁও টার্মিনাল সেটির সফল শুরু।”
চট্টগ্রাম-নাজিরহাট-খাগড়াছড়ি বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এত বছর ধরে রাস্তায় গাড়ি রাখার কারণে প্রতিনিয়ত চুরির ঝুঁকি, দুর্ঘটনা ও পুলিশের মামলার সম্মুখীন হতে হতো। স্থায়ী টার্মিনাল পাওয়ায় এখন চালক ও শ্রমিকরা নিশ্চিন্তে গাড়ি পরিচালনা করতে পারবেন। অন্যদিকে, অক্সিজেন মোড়ে ধুলাবালি ও কাদার মধ্যে বাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা নারী ও শিশু যাত্রীরা এবার একটি আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক টার্মিনালের নাগরিক সুবিধা উপভোগ করবেন। নির্মাণ কাজ শেষে চসিক খুব শীঘ্রই আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে টার্মিনালটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে, যা সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব আয়ের অন্যতম একটি বড় উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখবে।























