ঢাকা ০৫:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কলম ও রণাঙ্গনের অকুতোভয় সারথি: রইসুল হক বাহারের ৮ম প্রয়াণবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

  • আপডেট সময় : ০৮:৫৩:৪১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 9

রাসেল চৌধুরী

বন্দুক আর কলম—দুটোকেই সমান্তরালে চালিয়েছিলেন তিনি। একাত্তরে যিনি শত্রুর বুকে কাঁপন ধরানো গেরিলা কমান্ডার, বাহাত্তর থেকে তিনিই আবার সমাজের অসঙ্গতি দূর করার কলম সৈনিক। তিনি আর কেউ নন, চট্টগ্রামের বরেণ্য সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম রইসুল হক বাহার। আজ ১৮ সেপ্টেম্বর, প্রগতিশীল সাংবাদিকতার এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৮ সালের আজকের এই দিনে ৬৬ বছর বয়সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন দীর্ঘ ৪৬ বছর গণমাধ্যমে আলো ছড়ানো এই ব্যক্তিত্ব।

 

১৯৫২ সালের ১ এপ্রিল নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের চরকাকড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রইসুল হক বাহার। তরুণ বয়সেই ১৯৬৯ সালে তিনি যোগ দেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে। কিন্তু বুকভরা দেশপ্রেম যাঁর, তিনি কী আর ঘরে বসে থাকতে পারেন? ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতের হাফলং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে উচ্চতর গেরিলা এবং বিস্ফোরক বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন।

 

চট্টগ্রামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর রসদবাহী কুখ্যাত ‘সোয়াত’ জাহাজ প্রতিরোধে নিউমুরিং এলাকার সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন তিনি। তাঁর সাহসিকতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক কৈবল্যধাম রেল স্টেশন ও রেল ব্রিজ অপারেশনে, যেখানে বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁর নিখুঁত পরিকল্পনা ও বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্বে সফল গেরিলা অপারেশন পরিচালিত হয়েছিল।

 

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে হিসাব কর্মকর্তা হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরে নিজের পেশাদার জীবন শুরু করলেও, তাঁর ভেতরের সাংবাদিক সত্ত্বা তাঁকে ডেস্কে আটকে রাখতে দেয়নি। ১৯৭২ সালেই চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক সেবক পত্রিকার মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর ৪৬ বছরের দীর্ঘ ও বর্ণিল সাংবাদিকতা জীবন।

 

পরবর্তীতে তিনি জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করেছেন। ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এর চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান (২০১০-২০১৫) হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি দৈনিক পূর্বকোণ-এর সহযোগী সম্পাদক এবং দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ-এর বার্তা সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়াও তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সমৃদ্ধ করেছে দৈনিক গণকণ্ঠ, পিপলস ভিউ এবং ডেইলি সান-এর মতো পত্রিকাগুলোকে।

 

রইসুল হক বাহার কেবল সাময়িকী বা দৈনিকের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিবিষ্ট গবেষকও। তাঁর সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দর’ গ্রন্থটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিল। প্রিয়জিৎ দেবসরকারের মূল ইংরেজি গ্রন্থ থেকে তাঁর অনূদিত ‘পশ্চিম পাকিস্তানের শেষ রাজা’ বইটি রাজনৈতিক বোদ্ধাদের কাছে দারুণ সমাদৃত। এছাড়াও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘মুক্তিযুদ্ধের আর্কাইভ’ প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন নেপথ্যের মূল রূপকার।

 

আজ এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রাজ্ঞ সাংবাদিকের প্রয়াণ দিবসে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীতে তাঁর পরিবার, সহকর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে স্মরণসভা ও দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। রণাঙ্গন থেকে নিউজ ডেস্ক—সবখানেই সততা ও সাহসের যে পদচিহ্ন তিনি রেখে গেছেন, তা বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য এক অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস।

জনপ্রিয় সংবাদ

মাইজভাণ্ডারী তরিকায় আত্মনিবেদন ও ইশকের অনন্য উপাখ্যান: খলিফায়ে গাউসুল আজম আব্দুল আজিম মাইজভান্ডারী

কলম ও রণাঙ্গনের অকুতোভয় সারথি: রইসুল হক বাহারের ৮ম প্রয়াণবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

আপডেট সময় : ০৮:৫৩:৪১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাসেল চৌধুরী

বন্দুক আর কলম—দুটোকেই সমান্তরালে চালিয়েছিলেন তিনি। একাত্তরে যিনি শত্রুর বুকে কাঁপন ধরানো গেরিলা কমান্ডার, বাহাত্তর থেকে তিনিই আবার সমাজের অসঙ্গতি দূর করার কলম সৈনিক। তিনি আর কেউ নন, চট্টগ্রামের বরেণ্য সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম রইসুল হক বাহার। আজ ১৮ সেপ্টেম্বর, প্রগতিশীল সাংবাদিকতার এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৮ সালের আজকের এই দিনে ৬৬ বছর বয়সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন দীর্ঘ ৪৬ বছর গণমাধ্যমে আলো ছড়ানো এই ব্যক্তিত্ব।

 

১৯৫২ সালের ১ এপ্রিল নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের চরকাকড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রইসুল হক বাহার। তরুণ বয়সেই ১৯৬৯ সালে তিনি যোগ দেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে। কিন্তু বুকভরা দেশপ্রেম যাঁর, তিনি কী আর ঘরে বসে থাকতে পারেন? ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতের হাফলং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে উচ্চতর গেরিলা এবং বিস্ফোরক বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন।

 

চট্টগ্রামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর রসদবাহী কুখ্যাত ‘সোয়াত’ জাহাজ প্রতিরোধে নিউমুরিং এলাকার সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন তিনি। তাঁর সাহসিকতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক কৈবল্যধাম রেল স্টেশন ও রেল ব্রিজ অপারেশনে, যেখানে বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁর নিখুঁত পরিকল্পনা ও বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্বে সফল গেরিলা অপারেশন পরিচালিত হয়েছিল।

 

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে হিসাব কর্মকর্তা হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরে নিজের পেশাদার জীবন শুরু করলেও, তাঁর ভেতরের সাংবাদিক সত্ত্বা তাঁকে ডেস্কে আটকে রাখতে দেয়নি। ১৯৭২ সালেই চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক সেবক পত্রিকার মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর ৪৬ বছরের দীর্ঘ ও বর্ণিল সাংবাদিকতা জীবন।

 

পরবর্তীতে তিনি জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করেছেন। ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এর চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান (২০১০-২০১৫) হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি দৈনিক পূর্বকোণ-এর সহযোগী সম্পাদক এবং দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ-এর বার্তা সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়াও তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সমৃদ্ধ করেছে দৈনিক গণকণ্ঠ, পিপলস ভিউ এবং ডেইলি সান-এর মতো পত্রিকাগুলোকে।

 

রইসুল হক বাহার কেবল সাময়িকী বা দৈনিকের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিবিষ্ট গবেষকও। তাঁর সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দর’ গ্রন্থটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিল। প্রিয়জিৎ দেবসরকারের মূল ইংরেজি গ্রন্থ থেকে তাঁর অনূদিত ‘পশ্চিম পাকিস্তানের শেষ রাজা’ বইটি রাজনৈতিক বোদ্ধাদের কাছে দারুণ সমাদৃত। এছাড়াও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘মুক্তিযুদ্ধের আর্কাইভ’ প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন নেপথ্যের মূল রূপকার।

 

আজ এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রাজ্ঞ সাংবাদিকের প্রয়াণ দিবসে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীতে তাঁর পরিবার, সহকর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে স্মরণসভা ও দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। রণাঙ্গন থেকে নিউজ ডেস্ক—সবখানেই সততা ও সাহসের যে পদচিহ্ন তিনি রেখে গেছেন, তা বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য এক অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস।